শান্তির সুর এখনও গুঞ্জরিত হচ্ছিল দোহায় স্বাক্ষরিত চুক্তির পাতায়। অক্টোবরের সীমান্ত রক্তক্ষয়ের পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সেই স্বপ্ন, যা দুই দেশকে নতুন পথে হাঁটার আশা দিয়েছিল, এখন আবার রক্তের ছাপ মেখে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার ইসলামাবাদের আদালতের সামনে ভয়াবহ আত্মঘাতী বিস্ফোরণের পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, “এটি শুধু একটি হামলা নয়, গোটা পাকিস্তানের জন্য এক সতর্ক ঘণ্টা। যুদ্ধ এখন আমাদের দোরগোড়ায়।”
তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “কাবুলের শাসকরা চাইলে এই সন্ত্রাস থামাতে পারে। কিন্তু যখন তারা যুদ্ধকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত নিয়ে আসে, তখন আমাদেরও জবাব দিতে হবে শক্ত হাতে।”
অক্টোবরের রক্তপাতের পর তুরস্কের মধ্যস্থতায় দোহায় যে চুক্তি হয়েছিল, সেটি স্থায়ী শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু ইস্তানবুলে দুই দফা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরও তুরস্কের প্রতিনিধি দল এই সপ্তাহে পাকিস্তানে আসার কথা থাকলেও, মঙ্গলবারের বিস্ফোরণ হয়তো শেষ করে দিতে পারে শান্তির ক্ষীণ আশাটুকু।
যদিও তালেবান সরকার ইসলামাবাদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে, পাকিস্তানের মন্ত্রীদের কণ্ঠে ক্রমেই শোনা যাচ্ছে যুদ্ধের আহ্বান। আসিফ বলেন, “আফগানদের ইতিহাসই বিদ্রোহের ইতিহাস। তাই তাদের প্রতিরোধের জবাব দিতে আমাদের প্রথাগত যুদ্ধেই ভরসা রাখতে হবে।”
বন্ধুত্ব থেকে বিভাজন
এক সময় আফগান তালেবান ছিল পাকিস্তানের মিত্র। ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলে ইসলামাবাদে আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই সম্পর্ক ঠান্ডা হয়ে এখন পরিণত হয়েছে অভিযোগের যুদ্ধে।
পাকিস্তান অভিযোগ করছে, কাবুল আশ্রয় দিচ্ছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে—যারা ২০০৭ সাল থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবিরাম সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, ইসলামাবাদ বলছে, আফগানিস্তানে আশ্রয় নিচ্ছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি ও আইএসআইএল (আইএসআইএস)-এর স্থানীয় শাখাও।
২০২৪ সালে পাকিস্তানে ২,৫০০ জন মানুষ নিহত হয় সন্ত্রাসী হামলায়—দশকের ভয়াবহতম বছরগুলোর একটি। আর ২০২৫ সাল সেই সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে।
একই সময়ে দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের ওয়ানা শহরে সেনা অভিযানে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে শত শত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী।
যুদ্ধ না কি কূটনীতি?
বিস্ফোরণের পর উত্তেজনা তুঙ্গে উঠলেও বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
ইসলামাবাদের থিংক ট্যাঙ্ক “জিওপলিটিক্যাল ইনসাইটস”-এর প্রধান ফাহাদ নাবিল বললেন, “যদি পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তা আন্তর্জাতিকভাবে নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। বরং তারা কূটনৈতিক পথেই এগোতে চাইবে।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইফতিখার ফিরদাউস বলেন, “তুর্কি প্রতিনিধি দলের সফর এই ইঙ্গিত দেয় যে দুই দেশই এখনো সংলাপের দুয়ার বন্ধ করেনি।”
আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল কাহার বালখি ইসলামাবাদ ও ওয়ানার হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আমরা গভীর শোক ও ঘৃণা প্রকাশ করছি। শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হোক, আমরা তা চাই না।”
দিল্লির বিস্ফোরণ: নতুন অশনি সংকেত
একই সপ্তাহে ভারতের রাজধানী দিল্লিতেও ভয়াবহ গাড়ি বিস্ফোরণে নিহত হয় অন্তত ১৩ জন। ঐতিহাসিক লাল কেল্লার কাছে ঘটিত এই হামলা ভারতের দ্বিতীয় বড় আক্রমণ এ বছর। এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের পাহালগামে ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিল ডজনখানেক সাধারণ মানুষ।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তখনই সতর্ক করেছিলেন—ভারতের মাটিতে যে কোনো হামলা পাকিস্তানের হামলার সমান ধরা হবে।
এদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে যখন দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা, তখনই আফগানিস্তান ও ভারতের সম্পর্ক দৃঢ় হচ্ছে। গত অক্টোবরে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুতাকি সফর করেন দিল্লি—যার সময়েই পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে ছড়ায় গুলি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এখন অভিযোগ করছেন, “ইসলামাবাদ ও ওয়ানার হামলা ভারতের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নমুনা।”
ভারত অবশ্য এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, “এসব ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।”
আগুনের রেখায় কূটনীতি
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফিরদাউসের ভাষায়, “পাকিস্তান সরাসরি ভারতকে দোষারোপ করছে না, কিন্তু সে তার পুরনো বয়ান পুনরাবৃত্তি করছে—যে পাকিস্তান সন্ত্রাসের শিকার, প্ররোচক নয়।”
তবু প্রশ্ন রয়ে যায়—এই উত্তপ্ত আঞ্চলিক পরিস্থিতি কি দক্ষিণ এশিয়াকে আবারো যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে?
ফিরদাউস মনে করেন, “পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা কম, তবে আফগানিস্তান আবার হয়ে উঠতে পারে বিশ্বশক্তির নতুন খেলার মঞ্চ।”
ফাহাদ নাবিলও বলেন, “পাকিস্তান এখনো কূটনীতির পথকে শেষ আশ্রয় হিসেবে দেখছে। কিন্তু যদি সেই পথ ব্যর্থ হয়, তখন সীমিত সামরিক হামলার পথ খোলা থাকবে।”
একদিকে বারুদের গন্ধ, অন্যদিকে শান্তির নরম প্রতিশ্রুতি—দক্ষিণ এশিয়া এখন যেন দুই প্রান্তে ঝুলে থাকা এক দড়ির উপর হাঁটছে। এক ভুল পদক্ষেপেই ভেঙে যেতে পারে সেই দোলানো ভারসাম্য।
















