ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন গাজা শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করায় যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনাটিতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের বিনিময়ে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির মাধ্যমে গাজা পরিচালনার প্রস্তাব ছিল।
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনা কার্যত অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল এরই মধ্যে গাজার ৭০ শতাংশের বেশি এলাকায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং যুদ্ধবিরতির মধ্যেও নিয়মিত হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
গাজায় নেতানিয়াহুর অবস্থান নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও হত্যাকাণ্ড, বোমা হামলা ও সামরিক অভিযান বাড়তে পারে। গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরও নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তকে শান্তি আলোচনার পথে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং যুদ্ধ ও মানবিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে।
হামাস অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী ও চুক্তির নিশ্চয়তাদানকারী পক্ষগুলোর প্রতি যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন এবং কোনো পক্ষের লঙ্ঘন ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
নেতানিয়াহুর অবস্থানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াও জোরালো হয়েছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা তুলে ধরে এটিকে মিসর, আরব ও মুসলিম দেশগুলোর জন্য ‘লাল রেখা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হলে যেখানে গাজায় বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে, সেখান থেকে মানুষের চলে যাওয়াকে স্বেচ্ছামূলক বলা যায় না।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত করা মূলত চুক্তি বাস্তবায়ন ঠেকানোর একটি কৌশল। তাঁদের মতে, গাজার বাস্তব পরিস্থিতিতে নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করার নিরপেক্ষ ব্যবস্থা ও অস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ হিসাব না থাকায় এই শর্ত বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থও সিদ্ধান্তটির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অক্টোবরের নির্বাচনের আগে তিনি ইসরায়েলের ডানপন্থী ভোটারদের কাছে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিরুদ্ধে দৃঢ় নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন বলে তাঁদের ধারণা। দুর্নীতির অভিযোগে চলমান মামলার রাজনৈতিক প্রভাবও তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে চাপ বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর অবস্থান শুধু গাজার যুদ্ধবিরতিই নয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণেও নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারীরা ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
















