মিশর আবারও ভোটের উত্তাপে উষ্ণ হয়ে উঠেছে। সোমবার শুরু হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ—একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার সূচনা, যা আগামী সংসদের ৫৯৬ আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এর আগেই ৭ ও ৮ নভেম্বর প্রবাসী মিশরীয়রা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
এই নির্বাচন এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেশটি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি মধ্যস্থতায় কাতারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে কায়রো। সম্প্রতি লেবাননেও দেশটির কূটনীতিকদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির তৃতীয় মেয়াদের শেষ বড় নির্বাচন, যা তাঁর শাসন কাঠামোর ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রথম ধাপে ১৪টি গভর্নরেটে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে—এর মধ্যে রয়েছে আলেকজান্দ্রিয়া, গিজা, লুক্সর, মিনিয়া, আসওয়ানসহ অন্যান্য অঞ্চল। দ্বিতীয় ধাপে বাকি ১৩টি গভর্নরেটে ভোট হবে নভেম্বরের শেষ দিকে। পুরো নির্বাচনের ফল ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ জানা যেতে পারে।
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সকাল থেকে ভোটগ্রহণ চলছে ৫ হাজার ৬০৬টি কেন্দ্রে, আর গণনা তত্ত্বাবধান করছে ৭০টি কমিটি।
মোট ৫৯৬ আসনের মধ্যে ২৮৪টি ব্যক্তি প্রার্থীদের জন্য, ২৮৪টি দলীয় তালিকার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, আর বাকি ২৮টি আসন রাষ্ট্রপতির নিয়োগে পূরণ হবে। আইন অনুযায়ী, অন্তত এক-চতুর্থাংশ আসন নারী প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত।
প্রথম ধাপের ফল ঘোষণা হবে ১৮ নভেম্বর। প্রয়োজনে পুনর্ভোট অনুষ্ঠিত হবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। দ্বিতীয় ধাপের ভোট প্রবাসীদের জন্য ২১ ও ২২ নভেম্বর, আর দেশের ভেতরে ২৪ ও ২৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
এই নির্বাচনে ১২টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল লিস্ট ফর ইজিপ্ট, জেনারেশন লিস্ট, পপুলার লিস্ট, ইউর ভয়েস ফর ইজিপ্ট লিস্ট ও ইজিপ্ট কল লিস্ট—যাদের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কায়রো ও কেন্দ্রীয় ডেল্টা অঞ্চল থেকে ১০২টি আসন, আপার ইজিপ্ট থেকে আরও ১০২টি আসন, আর পূর্ব ও পশ্চিম ডেল্টা অঞ্চল থেকে ৪০টি করে আসন নির্ধারণ করা হবে দলীয় তালিকার মাধ্যমে।
বিদেশে ভোটগ্রহণও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। ১১৭টি দেশে ১৩৯টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে প্রবাসী মিশরীয়রা ভোট দেন। কায়রোর জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ পরিচালনা করে।
সংসদ সদস্যরা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। বর্তমানে কার্যরত সংসদের মেয়াদ শেষ হবে জানুয়ারি ২০২৬-এ।
নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভোট শুধু সংসদ নয়, মিশরের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতিফলনও বয়ে আনবে। প্রেসিডেন্ট সিসির মেয়াদ ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর সাংবিধানিক পরিবর্তনের পর, অনেকেই ধারণা করছেন ভবিষ্যতে আবারও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
তবে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছেন এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে—বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা সংকট এবং নতুন ভাড়া আইন নিয়ে তীব্র উদ্বেগের মধ্য দিয়ে।
তাহরির ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির গবেষক হালেম হেনিশ লিখেছেন, “২০২৫ সালের সংসদই নির্ধারণ করবে মিশরের ২০৩০-পরবর্তী রাজনৈতিক ও আইনগত পথচলা। এই সংসদের গঠনই ভবিষ্যতের সংকেত দেবে।”
















