ওয়াশিংটন যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে ভারমুক্তির আশায়। টানা একচল্লিশ দিন ধরে চলা ইতিহাসের দীর্ঘতম সরকারি অচলাবস্থা অবশেষে আলো দেখতে শুরু করেছে। সপ্তাহান্তের টানটান আলোচনার পর মার্কিন সিনেট রবিবার এক প্রক্রিয়াগত ভোটে সম্মতি দিয়েছে— একটি অস্থায়ী অর্থায়ন বিল নিয়ে আগানো যাবে, যা সরকারকে আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত চালু রাখবে।
রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেটর জন থুন এই প্রস্তাবটি সামনে নিয়ে আসেন। ৬০-৪০ ভোটে গৃহীত এই পদক্ষেপটি মূলত একটি প্রাথমিক ধাপ, যা বিলটিকে আনুষ্ঠানিক বিতর্ক ও ভোটের পর্যায়ে নিয়ে যাবে। আটজন ডেমোক্র্যাট সদস্য রিপাবলিকানদের সঙ্গে একাত্মতা দেখিয়ে বিলটি এগিয়ে নিতে ভোট দেন।
এই বিলটি যদি শেষ পর্যন্ত সিনেটে পাস হয়, তবে তা প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদনের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হবে। বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন সংখ্যা ৫৩ এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২২০ আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১২।
সরকারি কার্যক্রম বন্ধের প্রভাব এখন গোটা আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। উড়োজাহাজ চলাচলে বিশৃঙ্খলা, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি স্থগিত, আর প্রায় তেরো লাখ সরকারি কর্মচারী বেতনহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস জানিয়েছে, ৭ লাখ ৫০ হাজার কর্মচারী ছাঁটাই বা সাময়িক বরখাস্তের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার মজুরি হারাচ্ছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে মোট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৬ বিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতে প্রায় ১.৫ শতাংশ পতন ঘটাবে।
বিলটিতে কিছু খাতে বার্ষিক অর্থায়ন রাখা হয়েছে— বিশেষ করে খাদ্য সহায়তা ও আইনসভা বিভাগের জন্য। তবে এতে স্বাস্থ্যবিমা ভর্তুকি বাড়ানোর কোনো ব্যবস্থা নেই, যা ডেমোক্র্যাটরা জোর দিয়ে দাবি করে আসছিলেন। স্বাস্থ্যসেবা আইন বা ওবামাকেয়ারের আওতায় নিম্নআয়ের মানুষদের বেসরকারি বিমা নিতে করছাড় দেওয়া হয়, যা এ বছর শেষ হতে চলেছে। রিপাবলিকান ও কিছু মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটরা সম্মত হয়েছেন, ডিসেম্বর মাসে এ ভর্তুকি বাড়ানোর বিষয়ে আলাদা ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা থুন বলেন, “আমরা দলমত নির্বিশেষে সংকট নিরসনের পথে এগোচ্ছি।” অন্যদিকে সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার সমালোচনায় মুখর। তিনি বলেন, “মাসের পর মাস আমরা স্বাস্থ্যসেবা সংকট সমাধানে লড়েছি, অথচ এই বিল সেই সমস্যার কোনো সমাধান দেয় না।”
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, “অর্থবহ সংস্কারের জন্য ওবামাকেয়ারের নামে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বীমা কোম্পানিগুলো পায়, তা সরাসরি জনগণের ব্যাংক একাউন্টে পাঠানো উচিত, যাতে তারা নিজেরাই ভালো স্বাস্থ্যবিমা নিতে পারে।”
এদিকে স্বাধীন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেছেন, এই মুহূর্তে নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসা হবে “একটি ভয়াবহ ভুল”। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি মনে করেন, সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে ভোটারদের এই প্রত্যাশাই কাজ করেছে— তারা যেন আপস না করে মানুষের পক্ষে থাকে।
নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি জয়লাভ করেছেন, একই দিনে নিউ জার্সি ও ভার্জিনিয়াতেও গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় হয়েছে।
অচলাবস্থার শুরু থেকে ডেমোক্র্যাটরা সরকার পুনরায় চালু করতে ১৪ বার ভোটে অংশ নিলেও প্রতিবারই স্বাস্থ্যবিমা ভর্তুকির দাবিতে আপস করেননি।
ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের অধ্যাপক স্কট লুকাস জানান, প্রায় ৪২ মিলিয়ন আমেরিকান এখন খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি হারিয়েছেন, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন রাজ্যগুলোকে সেই অর্থ ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হান্না বলেন, “ক্লোচার ভোট পাস হওয়ার অর্থ হলো, এর পরের ভোটগুলো আর তিন-পঞ্চমাংশ নয়, বরং সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গৃহীত হবে। অর্থাৎ সিনেটে এই বিল পাস হওয়ার পথে এখন আর তেমন কোনো বড় বাধা নেই।”
যদি সব ধাপ অতিক্রম করে বিলটি শেষ পর্যন্ত আইন হয়, তবে সরকারি কর্মচারীরা পুনরায় কাজে ফিরবেন, রাজ্য সরকারগুলো ক্ষতিপূরণ পাবে এবং আমেরিকার অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়— এই সমাধান কি কেবল অস্থায়ী, নাকি এটি আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন দ্বন্দ্বের সূচনা?
















