বাগদাদের আকাশে আবারও ইতিহাসের আলোড়ন। মঙ্গলবার সকালে ইরাকের ১৮টি প্রদেশ জুড়ে শুরু হচ্ছে সংসদ নির্বাচন, যেখানে ভোট দেবেন লক্ষ লক্ষ ইরাকি নাগরিক— এক নতুন ভবিষ্যতের আশায়, এক স্থিতিশীল রাষ্ট্রের স্বপ্নে।
এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে প্রশ্ন একটাই— জনগণ কি এখনও আস্থা রাখে সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি, যা ২০০৩ সালের মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকে দেশটিকে টেনে নিচ্ছে অস্থিরতার ঘূর্ণাবর্তে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের ভোটের উপস্থিতিই নির্ধারণ করবে ইরাকিদের সেই আস্থা কতটুকু অবশিষ্ট আছে— নিরাপত্তা ও মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ এই রাজনৈতিক কাঠামোতে।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের পর যে বিশৃঙ্খলার জন্ম হয়েছিল, তা আজও দেশটিকে তাড়া করছে। শিয়া-সুন্নি সংঘাত, আইএসআইএল-এর উত্থান, আর দীর্ঘ যুদ্ধের ক্ষত— সব মিলিয়ে ইরাকের গণতন্ত্র এখনও টলমল।
প্রথম নির্বাচিত সরকার আসে ২০০৫ সালে, কিন্তু দুই দশক পেরিয়েও নাগরিকরা দেখেননি কাঙ্ক্ষিত উন্নতি। একই মুখ, একই প্রতিশ্রুতি, আর ক্ষমতালোভী মিলিশিয়া-নেতাদের আধিপত্য— ইরাকের রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া যেন পৌঁছায় না কখনোই। তবুও, আশার প্রদীপ হাতে, মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে ভোটকেন্দ্রের দিকে।
৩২৯টি সংসদীয় আসনের জন্য এবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন প্রায় সাত হাজার সাতশত চুয়াল্লিশ জন প্রার্থী। এর মধ্যে নারীদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে ২৫ শতাংশ বা ৮৩টি আসন। রবিবার বিশেষ ভোটে অংশ নিয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ও ২৬ হাজার বাস্তুচ্যুত নাগরিক।
ভোট হবে ইরাকের ১৮টি প্রদেশে। নতুন গঠিত হালাবজা প্রদেশ এবার সুলাইমানিয়ার সঙ্গে একত্রে ভোট দেবে।
এই নির্বাচনেও বহাল রয়েছে “মুহাসাসা” বা কোটাভিত্তিক ব্যবস্থা— যেখানে সুন্নি হবেন সংসদের স্পিকার, শিয়া হবেন প্রধানমন্ত্রী, আর কুর্দ হবেন প্রেসিডেন্ট। মার্কিন আগ্রাসনের পর জাতিগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রবর্তিত এই পদ্ধতিই আজ ইরাকের রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতির মূল কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
প্রধান শিয়া দলগুলোর মধ্যে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির মধ্যে। ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসা সুদানি দ্বিতীয় মেয়াদের আশা করছেন, কিন্তু শিয়া কোঅর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্কের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তার পথ কঠিন করে তুলেছে।
সুন্নি রাজনীতিতে এগিয়ে আছে তাকাদ্দুম পার্টি, যার নেতৃত্বে রয়েছেন স্পিকার মোহাম্মদ আল-হালবুসি। পশ্চিম ও উত্তর ইরাকের সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় তাঁরই দাপট।
কুর্দ রাজনীতিতে লড়াই চলছে কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপি) ও প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান (পিইউকে)-এর মধ্যে। কেডিপি তেল রাজস্বে অধিক ভাগ চায়, আর পিইউকে বাগদাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
এদিকে প্রভাবশালী শিয়া ধর্মগুরু মোকতাদা আল-সাদর তাঁর অনুসারীদের ভোট বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, মুহাসাসা ব্যবস্থা ইরাকের গণতন্ত্রকে পঙ্গু করেছে; এটি বদলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে। তবে সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, এতে একনায়কতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞ তামির বাদাওয়ি মনে করেন, সাদরপন্থীদের অনুপস্থিতি নতুন সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা আরও দুর্বল হবে।
মোট ৩২ মিলিয়ন যোগ্য ভোটারের মধ্যে এবারে ভোটার নিবন্ধন করেছেন ২১.৪ মিলিয়ন মানুষ— ২০২১ সালের তুলনায় অনেক কম। তখন ভোট পড়েছিল মাত্র ৪১ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। এবার সেই সংখ্যাও আরও কমতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিক্ষুব্ধতা বাড়ছে— তারা মনে করে, কোটাভিত্তিক রাজনীতি কেবল দুর্নীতি ও অন্যায়কে টিকিয়ে রাখে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সুদানি দ্বিতীয় মেয়াদের আশায় থাকলেও তাঁর পথে বাধা অসংখ্য। যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে চাপ দিচ্ছে জনপ্রিয় পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স বা হাশদ আল-শাবিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে, যারা আইএসআইএল দমনে বড় ভূমিকা রাখলেও এখন ইরানের প্রভাবের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
সুদানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এই মিলিশিয়াদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করে সেনাবাহিনীর অধীনে আনার। কিন্তু এই গোষ্ঠীগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এত গভীর যে তা সহজ নয়।
অন্যদিকে নুরি আল-মালিকি, যিনি দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আবারও সেই পদে চোখ রেখেছেন। যদিও তাঁর আমলেই সাম্প্রদায়িক বিভাজন গভীর হয়েছিল এবং আইএসআইএল-এর উত্থান ঘটেছিল।
ইরাকের এই নির্বাচন তাই কেবল সংসদ গঠনের প্রতিযোগিতা নয়— এটি এক জাতির আত্মপরিচয়ের লড়াই, যেখানে ভোটবাক্সে জমা হবে ক্ষোভ, স্মৃতি ও আশার গল্প।
















