ঢাকা, ১০ নভেম্বর ২০২৫:
অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, আইন লঙ্ঘন এবং দক্ষ কর্মীর অভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে কমছে, যা জনশক্তি রপ্তানি খাতে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি করছে। এমনকি সবচেয়ে বড় ভরসার শ্রমবাজার সৌদি আরবেও নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ওমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় দেশের শ্রমবাজারের গণ্ডি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের মতে, দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা করে নতুন বাজার চালু এবং বন্ধ বাজারগুলো খুলতে না পারলে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স খাত ক্ষতির মুখে পড়বে।
বন্ধ শ্রমবাজার ও সৌদি আরবের জটিলতা
বর্তমানে বাংলাদেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারের মধ্যে তিনটিই সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, এবং চালু থাকা একমাত্র বাজারেও জটিলতা বাড়ছে।
১. সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ওমান
সৌদি আরব ছাড়া বাকি তিনটি প্রধান শ্রমবাজার—সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), মালয়েশিয়া ও ওমান—থেকে কর্মী পাঠানো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এক বছরেরও বেশি সময় পার করলেও এই বাজারগুলো চালু করতে পারেনি।
| দেশ | ২১ বছরে মোট কর্মী | মোট শ্রমবাজারের (%) | বর্তমান পরিস্থিতি |
| সৌদি আরব | ৪৮ লাখ ১৩ হাজার ৯৪৩ জন | ৩৪.৪% | চালু, তবে জটিলতা বাড়ছে। |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ২২ লাখ ০৭ হাজার ৯৯১ জন | ১৫.৮২% | সম্পূর্ণ বন্ধ। |
| ওমান | ১৬ লাখ ৫৩ হাজার ৭৪৪ জন | ১১.৮৫% | প্রায় বন্ধ (চলতি বছরে গেছেন মাত্র ৪৩ জন)। |
| মালয়েশিয়া | ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৩৩৩ জন | ৯.৩০% | বন্ধ। |
| বাহরাইন | ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬১০ জন | ২.২৫% | প্রায় বন্ধ (গত দুই বছরে প্রায় কোনো শ্রমিক যায়নি)। |
২. সৌদি আরবে নানা জটিলতা বৃদ্ধি
যদিও সৌদি আরব এখনো সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার, এখানে কর্মী পাঠানোর হার কমছে।
- ‘তাকামুল’ সনদ: বর্তমানে সাধারণ কর্মীসহ সব পেশার কর্মীর জন্য ‘তাকামুল’ (দক্ষতার পরীক্ষায় পাস করা সনদ) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই পরীক্ষার জন্য কর্মীপ্রতি অতিরিক্ত ৫০ ডলার (৬,১০০ টাকা) ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদী অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রক্রিয়ার কারণে কর্মীদের ভোগান্তি বাড়ছে।
- কর্মীদের উদ্বেগ: তাকামুল সনদ ছাড়াও দেশটিতে যাওয়ার পর আকামা, চাকরি, বেতনসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে কর্মীদের অভিযোগ।
৩. ইউরোপের বাজারে হুমকি: ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট
ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহারের ফলে পূর্ব ইউরোপের দুটি দেশের শ্রমবাজার হুমকির মুখে পড়েছে।
- সার্বিয়া ও উত্তর মেসিডোনিয়া: এই দেশ দুটির ভিসা আবেদনে ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ায় তারা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। উত্তর মেসিডোনিয়ায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে।
- পরিণতি: সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, জালিয়াতি না থামালে শিগগিরই বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ভিসা বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। উত্তর মেসিডোনিয়াতে জালিয়াতির অভিযোগে একটি বাংলাদেশি পাচারকারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
📉 নতুন গন্তব্যে সক্ষমতার অভাব
নতুন বাজার চালু এবং বন্ধ থাকা বাজারগুলো পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
মালয়েশিয়ায় অনিশ্চয়তা
গত বছর মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা ১৭ হাজার কর্মীর মধ্যে প্রথম ধাপে প্রায় আট হাজার জনকে দেশটি বাছাই করেছে।
- ধোঁয়াশা: প্রাথমিকভাবে যোগ্য নির্বাচন করা হলেও, নিয়োগদাতা থেকে এখনো কোনো চাহিদাপত্র পাঠানো হয়নি।
- সময়সীমা: আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই কর্মীদের পাঠানো নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, কারণ চাহিদাপত্র আনা, প্রশিক্ষণ, সাক্ষাৎকার, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ফ্লাইটসহ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে।
- পদ্ধতি: প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ৭,৮৬৯ জনকে নির্মাণ ও পর্যটন খাতে বোয়েসেল (BAESL)-এর মাধ্যমে পাঠানো হবে।
জাপানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি
অন্তর্বর্তী সরকার আগামী পাঁচ বছরে জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, সক্ষমতার অভাবে গতি আসেনি।
- প্রকৃত চিত্র: বিএমইটির তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে মাত্র ৯৬২ জন কর্মী জাপানে গেছেন।
- রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যর্থতা: চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৬২টি রিক্রুটিং এজেন্সি একজন কর্মীও পাঠাতে পারেনি, ফলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
- চাহিদা: জাপানে বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে, এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তাদের ১ কোটি ১০ লাখ বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হবে।
উত্তরণের জন্য ব্যবসায়ীদের পরামর্শ
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
- গবেষণা জরুরি: তিনি বলেন, শ্রমবাজারকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রমবাজারগুলো নিয়ে গবেষণা করাতে হবে। নতুন বাজার খোলা ও বন্ধ পুরনো বাজারগুলো কীভাবে খোলা যায়, তা নিয়ে গবেষণা জরুরি।
- কূটনৈতিক তৎপরতা: জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ থাকা দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে ওই দেশগুলোর শ্রমবাজার ফের উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। তিনি এই বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন।















