পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রামের চিংড়ি চাষি বুদ্ধদেব প্রধানের চোখে আজ শুধু চিন্তার ছায়া। প্রথম ফসল কাটার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দ্বিতীয় চিংড়ির চক্র শুরু করেছেন—একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, কারণ একই বছরে দু’বার চাষে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা প্রবল।
কিন্তু উপায় নেই। ঘরে সংসারের খরচ, মাঠে ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে তার দরকার অর্থ। তাই ঝুঁকিই আজ ভরসা।
কারণ একটাই—যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নতুন শুল্কে চিংড়ির দাম হঠাৎ ধসে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত এই শুল্কভার ভারতের চিংড়ি রপ্তানি শিল্পে যেন মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছে।
বুদ্ধদেব বলেন, “চিংড়ির দাম এত কমে গেছে যে বুঝতে পারছি না, তিন লাখ টাকা খরচের কোনোটা ফেরত পাব কি না।”
রপ্তানিতে দুঃসময়
ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিংড়ি উৎপাদক দেশ, ইকুয়েডরের পরেই অবস্থান। ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে দেশটি প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করেছে, যার প্রায় অর্ধেকই গেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
দেশে মূলত দুটি বাণিজ্যিক প্রজাতির চিংড়ি উৎপাদিত হয়—ব্ল্যাক টাইগার ও ভ্যানামেই (প্যাসিফিক হোয়াইটলেগ)। ভারতের মোট উৎপাদন প্রায় ১১ লাখ টন, যার ৯৫ শতাংশই ভ্যানামেই।
দুটি চক্রে এই চিংড়ি চাষ হয়—ফেব্রুয়ারি থেকে জুন এবং জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু অধিকাংশ চাষিই দ্বিতীয় চক্রে যেতে ভয় পান রোগের ঝুঁকির কারণে।
চিংড়ি চাষ মূলত পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, গুজরাট, গোয়া, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও কেরালার উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে আছে। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে এই খাতে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় এক কোটি মানুষ।
শুল্কের দংশন
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র নতুন শুল্ক ঘোষণা করার পর থেকেই বাজারে চিংড়ির দাম কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা থেকে নেমে হয়েছে ২৩০ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ প্রায় ২৭৫ টাকা। ফলে চাষিদের লোকসান বাড়ছে হু হু করে।
নন্দীগ্রামের আরেক চাষি, নরদু দাস, আল জাজিরাকে বলেন, “যদি দাম না বাড়ে, তাহলে কৃষকেরা হয়তো বিষ খেয়ে মরবে।”
তার কথায়, “এই চাষে বিদ্যুৎ, জমি ভাড়া, খাবার—সব কিছুর খরচ প্রচুর। আমরা সঞ্চয় ভেঙে, ঋণ নিয়ে চাষ করি। কিন্তু যদি দাম পড়ে যায়, তখন ঘরে ভাত জোটে না।”
চাষিরা আশঙ্কা করছেন, প্রায় ৫৮ শতাংশ শুল্ক আরোপের ফলে—যার মধ্যে পাল্টা শুল্ক ৫.৭৭ শতাংশ ও অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক ২.৪৯ শতাংশ—তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজার পুরোপুরি হারাবে।
বিশ্লেষক রাহুল গুহ জানান, “যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সবসময়ই আকর্ষণীয়—লাভ বেশি, চাহিদা স্থিতিশীল, আর গ্রাহকও পুনরায় অর্ডার দেন। কিন্তু এই শুল্কের কারণে চাষিরা নতুন বিনিয়োগে অনীহা দেখাবেন।”
রোগ, নিম্নমানের বীজ আর বন্ধ হ্যাচারি
ভারতের চিংড়ি শিল্প আমেরিকা থেকেই মা চিংড়ি বা ব্রুড স্টক আমদানি করে। কিন্তু মাঝে মাঝে নিম্নমানের বীজে রোগ ছড়িয়ে যায়, যার ফলে পুরো পুকুরের চিংড়ি ফেলে দিতে হয়।
চিংড়ি চাষিদের সংগঠন ‘প্রন ফার্মারস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া’-এর সভাপতি আইপিআর মোহন রাজু বলেন, “আমরা বহুদিন ধরে সরকারের কাছে দাবি করছি, যেন দেশীয় মা চিংড়ি ব্যবহার করে বীজ উৎপাদন শুরু হয়। এতে রোগ কমবে, উৎপাদনও স্থিতিশীল হবে।”
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে প্রায় ৫৫০টি বেসরকারি হ্যাচারির ওপরও। দাম পড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা নতুন বীজ কিনছেন না। অন্তত অর্ধেক হ্যাচারি ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
‘অল ইন্ডিয়া শ্রিম্প হ্যাচারিজ অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি রবীদ কুমার ইয়েল্লানকি বলেন, “এখনই যদি বাজার না ঘোরে, তাহলে হ্যাচারিগুলোর ক্ষতি অসহনীয় হবে। ইতিমধ্যেই সাত থেকে আট বিলিয়ন বীজ ফেলে দিতে হয়েছে।”
ইকুয়েডরের ছায়া
ভারতের জন্য আরেক বড় চ্যালেঞ্জ এসেছে ইকুয়েডর থেকে। ভৌগোলিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি এই দেশ উচ্চমানের ভ্যানামেই চিংড়ি কম দামে রপ্তানি করছে।
ইকুয়েডরের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক মাত্র ১৫ শতাংশ, ফলে তাদের চিংড়িই এখন মার্কিন বাজারে বেশি জনপ্রিয়। এ বছরের প্রথম নয় মাসেই দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে এক মিলিয়নের বেশি টন চিংড়ি পাঠিয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি।
চিংড়ি বিশেষজ্ঞ মনোজ শর্মা মনে করেন, “এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের নতুন বাজার খুঁজতে হবে। আমরা বরাবরই বিদেশমুখী, কিন্তু এখন সময় এসেছে নিজেদের দেশীয় বাজারকেও গুরুত্ব দেওয়ার।”
চাষিদের হাহাকার
নন্দীগ্রামের খেতের পাশে দাঁড়িয়ে বুদ্ধদেব প্রধানের চোখে এক অজানা ক্লান্তি।
“আমরা সমুদ্রের সন্তান, কিন্তু এখন মনে হয় ঢেউও আমাদের শত্রু,” তিনি বলেন।
“যদি এই দাম না ওঠে, যদি বাজার না ফেরে, তাহলে এই চাষ আমাদের বাঁচাবে না—ডুবিয়ে দেবে।”















