দূর গাম্বিয়ার এক গ্রামীণ প্রান্ত থেকে ২৯ বছরের রাজমিস্ত্রি ওমর পাড়ি দিয়েছিলেন মরুভূমির দেশে—স্বপ্ন ছিল, সামান্য বেশি আয় করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। মৌরিতানিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোয়াধিবুতে এসে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে এক ঘরের ছোট কুটিরে বাসা নেন, নির্মাণস্থলে কাজ পান, আর অল্প সময়েই আগের চেয়ে দ্বিগুণ আয় শুরু করেন।
নয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও এক দরিদ্র ধানচাষির সন্তান ওমর দ্রুত কিছু টাকা জমিয়ে পরিবারকে পাঠাতেন, ভাইবোনদের স্কুলের ফি মিটাতেন। কিন্তু আগস্টের এক সকালেই তার এই জীবনে নেমে আসে অন্ধকার—সশস্ত্র ন্যাশনাল গার্ডের গাড়ি এসে শহর জুড়ে ধরপাকড় শুরু করে, টার্গেটে পড়ে অভিবাসীরা।
নির্মাণস্থলগুলো ছিল প্রথম শিকার। বসবাসের অনুমতিপত্র না থাকায় ওমর কাজ বন্ধ করেন, সীমিত করে ফেলেন নিজের চলাফেরা। কিন্তু তাতেও রক্ষা হয়নি। পুলিশ শুরু করে ঘরে ঘরে অভিযান—রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজা ভাঙার শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা।
এক রাতে পুলিশ যখন ওমরের বাড়ি ঘিরে ফেলে, তিনি ও তার বন্ধুরা ছাদ বেয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু যাওয়ার জায়গা না থাকায়, আবারও ফিরে আসেন সেই ভাঙা ঘরে। এরপর শুরু হয় অভাবের দিন—এক বাটির ভাত ভাগ করে খাওয়া, মাঝেমধ্যে বন্ধুর গোপনে ধরা মাছই ছিল একমাত্র আহার।
ওমর বলেছিলেন, “এক দিনে আমি যত অনুভবের ভেতর দিয়ে যাই, তা ভাষায় বলা যায় না।”
নির্বাসনের নির্মম বাস্তবতা
আল জাজিরা জানিয়েছে, মৌরিতানিয়ার রাজধানী নোয়াকশট, রোসো ও নোয়াধিবু জুড়ে চলছে ব্যাপক ধরপাকড় ও দেশান্তর অভিযান। মৌরিতানিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটস-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু মার্চ মাসেই প্রায় বারোশ মানুষকে দেশছাড়া করা হয়েছে, যাদের মধ্যে সাতশ জনেরই বৈধ কাজের অনুমতি ছিল।
সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে মুখপাত্র হোসেইন উলদ মেদো জানিয়েছেন, ২০২২ সালে দেশে প্রবেশ করেছিলেন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার অভিবাসী, অথচ মাত্র ৭ হাজার তাদের অনুমতি নবায়ন করেন।
এই অভিযান শুরু হয়েছে ঠিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মৌরিতানিয়ার ২১০ মিলিয়ন ইউরোর অভিবাসন চুক্তির পর, যা নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সহায়তার নামে স্বাক্ষরিত। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এর আড়ালেই শুরু হয়েছে আফ্রিকার দরিদ্র শ্রমিকদের দমননীতি।
ভয়ের শহর, ঘুষের রাজনীতি
নোয়াধিবু শহরটি বহুদিন ধরেই পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার অভিবাসীদের কাজের গন্তব্য। নির্মাণ, মাছধরা, বা অস্থায়ী শ্রমে জড়িত ছিল হাজারো মানুষ। কিন্তু এখন শহরের বাতাসে শুধু ভয়।
আইভরিয়ান নির্মাণশ্রমিক ত্রাওরে বলেন, এক সপ্তাহে তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রথমে ২০০ ডলার ঘুষ দিয়ে ছাড়া পান, পরেরবার বসই তাকে মুক্ত করান। তৃতীয়বার টাকা না থাকায় পুলিশ তাকে আটক করে রাখে, পরে আবার ঘুষ দিয়ে মুক্তি।
“আমরা জানি না কী করব,” বলেন তার সহকর্মী ওবি, “কাজে গেলেও ধরা পড়ার ভয়, না গেলেও ক্ষুধা।”
অনেকে বলছেন, “যার পকেটে টাকা আছে, কেবল সেই বাঁচে।” পুলিশ খাবার বিক্রি করে দ্বিগুণ দামে, ফোনে কথা বলার সুযোগও বিক্রি হয় ঘুষের বিনিময়ে।
ক্ষুধা, অশ্রু আর নির্বাসন
সিয়েরা লিওনের মারিয়াম নামের এক মা তার অসুস্থ শিশুর জন্য ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিলেন। পথে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। সন্তানদের কথা বলতেই উত্তর আসে, “এটা নথিপত্রের সময়, তোমার শিশুর নয়।” দুই দিন শিশুদের সঙ্গে এক ঘরে বন্দী থাকার পর, স্বামীর বস ঘুষ দিয়ে তাদের মুক্ত করেন।
গিনির ওমর ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয় খাবার কিনতে যাওয়ার সময়, চার বছরের মেয়ে তখন একা ঘরে। “আমি কেঁদেছিলাম, অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ কিছু শোনেনি,” বলেন ওমর, যিনি এখন সেনেগালের রোসো শহরে অস্থায়ী আশ্রয়ে আছেন।
সীমান্তে হারিয়ে যাওয়া জীবন
নোয়াধিবু থেকে আটক অভিবাসীদের নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানী হয়ে দক্ষিণ সীমান্তে, যেখানে তারা প্রায়শই শৃঙ্খলিত অবস্থায় থাকে। রোসো সীমান্তে তাদের নামিয়ে দেয়া হয় নদীর ধারে, সেখান থেকে অনেকেই ছোট নৌকায় পালিয়ে পার হন সেনেগালে।
কিন্তু কেউ কেউ ফিরে যেতে বাধ্য হন—পুলিশের নজর এড়াতে রাতের আঁধারে নদী পেরিয়ে আসেন, জলে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছান অন্য পারে, আবারও অনিশ্চিত জীবনে।
এক তরুণ বলেন, “আমাদের সঙ্গে যা করছে, তা যেন মানুষ নয়—জীবন্ত বোঝা ফেলে দিচ্ছে মরুভূমির ধুলায়।”
ফিরে গিয়েও শান্তি নেই
গাম্বিয়ায় ফিরে গিয়ে ওমর বললেন, “এখানে কেউ আমাদের তাড়া করছে না, কিন্তু কাজও নেই। পরিবার জিজ্ঞেস করছে, চালের বস্তা কোথায়? আমার কাছে শুধু নীরবতা।”
তবু মনে পড়ে নোয়াধিবুর সেই দিনগুলো, যখন কাজ ছিল, আশা ছিল।
“যদি তারা মানুষ ধরা বন্ধ করে, আমি আবার ফিরব,” ধীরে বলেন তিনি, সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে।















