বিশ্বজুড়ে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতি পূর্ব আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভয়াবহ বন্যা, খাদ্যসংকট, রোগব্যাধি ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটি সতর্ক করে বলেছে, কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দেশের অনেকগুলোই আগে থেকেই বিভিন্ন মানবিক সংকটে আক্রান্ত।
সংস্থাটির জরুরি কার্যক্রমবিষয়ক এক কর্মকর্তা বলেন, একই সময়ে একাধিক সংকট একত্রিত হচ্ছে এবং যেসব দেশের সক্ষমতা সবচেয়ে কম, তারাই এবার সবচেয়ে বড় আঘাতের মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে এবং এটি গত শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বছরের শেষ প্রান্তিকে এর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও জানিয়েছে, এল নিনোর পরিস্থিতি ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে এবং আগামী মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা এ সময়ের জন্য রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এল নিনো সাধারণত প্রতি কয়েক বছর পরপর দেখা দেয়। এ সময় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও খরা দেখা দেয়। পূর্ব আফ্রিকায় বছরের মাঝামাঝি সময় তুলনামূলক শুষ্ক থাকলেও বছরের শেষভাগে অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
সোমালিয়ার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চলতি বছরই একাধিকবার ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, অতীতের বড় বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে কৃষিজমি তলিয়ে যেতে পারে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন।
কেনিয়ার আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, বছরের বাকি সময়জুড়ে এল নিনোর প্রভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটি আগাম প্রস্তুতিও শুরু করেছে।
বাংলাদেশে চলতি মাসের শুরু থেকে পার্বত্য ধস ও বন্যায় কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে অন্তত পনেরো জন রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছেন এবং দশ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
পাকিস্তানেও একদিকে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ গলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, এল নিনো পূর্ণ শক্তিতে দেখা দিলে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে সারের দামও ইতোমধ্যে বেড়েছে, যা কৃষি উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো দুর্যোগের আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে দ্রুত অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, বিপর্যয় ঘটার পর নয়, আগাম প্রস্তুতি গ্রহণই মানবিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
















