বিশ্বের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার পর এবার চালকবিহীন ট্যাক্সি প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে চীন। রাজধানী বেইজিংসহ দেশটির কয়েকটি শহরে ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে স্বয়ংচালিত ট্যাক্সির পরীক্ষামূলক সেবা চালু হয়েছে।
বেইজিংয়ের ইঝুয়াং এলাকায় এখন নিয়মিতই চালকবিহীন ট্যাক্সি এবং স্বয়ংচালিত পণ্যবাহী যান চলাচল করছে। যাত্রীরা মোবাইলের মাধ্যমে গাড়ি ডেকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চালক ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন। এসব যানজটপূর্ণ সড়কে বাস, মোটরসাইকেল, সাইকেল ও পথচারীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে গড়ে ওঠা শক্তিশালী উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা চালকবিহীন যান প্রযুক্তিতেও চীনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যানবাহন তৈরি করছে, আর বিশেষায়িত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার উন্নয়ন করছে। একই সরবরাহব্যবস্থার কারণে ব্যাটারি, সংবেদক, ক্ষুদ্র প্রসেসর ও নিয়ন্ত্রণযন্ত্র সহজে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
চীনের বিভিন্ন শহরে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারি অনুমতি এবং সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জটিল নগর যানবাহন পরিবেশ এসব প্রযুক্তিকে দ্রুত উন্নত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ব্যস্ত সড়কে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ও মানুষের চলাচল থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে সফটওয়্যার আরও দক্ষ করা হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রযুক্তির বিস্তার সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মধ্যপ্রাচ্যের অতিরিক্ত তাপমাত্রা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারী বৃষ্টিপাত কিংবা ইউরোপের তীব্র শীতের মতো ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়া স্বয়ংচালিত যানের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া বৃষ্টি, তুষার ও কুয়াশার কারণে সংবেদক ও ক্যামেরার কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ট্যাক্সি নয়, যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং পণ্য পরিবহনেও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তাদের দাবি, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও এ খাতে প্রতিযোগিতায় রয়েছে। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিবহনসেবা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে, যা তাদের দ্রুত বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে সহায়তা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বয়ংচালিত ট্যাক্সি পরিচালনা বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির চেয়ে অনেক বেশি জটিল। কারণ এর সঙ্গে কঠোর নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, সড়কের বিস্তারিত মানচিত্র, স্থানীয় পরিচালনা ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের বিষয় জড়িত।
এছাড়া নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চলতি বছর চীনের একটি চালকবিহীন ট্যাক্সি সেবায় সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে বহু গাড়ি মাঝপথে থেমে যায় এবং কিছু যাত্রী সাময়িকভাবে গাড়ি থেকে বের হতে পারেননি। এমন ঘটনা প্রযুক্তিটির প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যনিরাপত্তা। চালকবিহীন ট্যাক্সি চলাচলের সময় বিপুল পরিমাণ অবস্থান, মানচিত্র ও ক্যামেরাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে বিদেশি বাজারে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণে নতুন বাধা তৈরি হতে পারে।
তবুও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, বিভিন্ন দেশের সরকার ধীরে ধীরে স্বয়ংচালিত প্রযুক্তির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, সঠিক নীতিগত সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে চালকবিহীন যান ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
















