যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সাধারণত মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহরের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। তবে যুদ্ধের আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী ভয়াবহ দিক রয়েছে, যা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দূষণ বহু বছর ধরে বাতাস, পানি ও মাটিকে বিষাক্ত করে তোলে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতেও সেই আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কয়েক সপ্তাহের হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানার ফলে আগুনে পুড়ছে তেলের মজুত ও স্থাপনা। এতে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত কণা, আর তেল ও রাসায়নিক বর্জ্য দূষিত করছে উপকূলীয় এলাকা ও সামুদ্রিক পরিবেশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতি বহু দশক স্থায়ী হতে পারে। অতীতেও মধ্যপ্রাচ্যে তেলকূপে আগুন লাগার ঘটনায় আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল এবং মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে ভয়াবহ দূষণ ছড়িয়ে পড়েছিল। এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে বহন করতে হয়েছে স্থানীয় মানুষকে।
ইউরোপের চলমান সংঘাতেও একই ধরনের বিপর্যয় দেখা গেছে। শিল্পকারখানা, জ্বালানি ডিপো ও রাসায়নিক গুদামে হামলার ফলে নদী, কৃষিজমি ও বাতাসে বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবেশবিষয়ক সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে হাজারো দূষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অবকাঠামো যুদ্ধের সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তেল শোধনাগার, পাইপলাইন বা জ্বালানি মজুত কেন্দ্রে হামলা হলে দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ত দূষণ তৈরি হয়। এতে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
যুদ্ধের কারণে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়লে পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। ফলে দূষণের দায় এড়ানো সহজ হয়ে যায় এবং স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ক্ষতির বোঝা বহন করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সংঘাতের সময় জ্বালানি সংকটে মানুষ কাঠ ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা বন উজাড় বাড়িয়ে দেয়। এতে পরিবেশের ভারসাম্য আরও নষ্ট হয়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নতুন পরিবেশগত সংকট তৈরি হয়। কারণ নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট ও ইস্পাত ব্যবহৃত হয়, যা উচ্চমাত্রার কার্বন নিঃসরণের সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্গঠনের সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতের দূষণ ও ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কারণ সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুশক্তির স্থাপনা ধ্বংস হলেও তা তেলভিত্তিক স্থাপনার মতো ভয়াবহ বিষাক্ত দূষণ সৃষ্টি করে না।
















