১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত, শিশু ও দেশীয় পণ্যে উপস্থিতির হার বেশি হওয়ায় বাড়ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহ উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হলেও টুথপেস্টে এই উপাদানের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা।
দেশের বাজারে প্রচলিত ও বহুল ব্যবহৃত টুথপেস্ট নিয়ে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় তিন-এক চতুর্থাংশ টুথপেস্টেই মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে উৎপাদিত ও বাজারজাত করা টুথপেস্টগুলোতে এই প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির হার তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি। এমনকি শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি টুথপেস্টেও মিলেছে ক্ষতিকর এই উপাদান। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (ইএসডিও)-এর এক বছরব্যাপী পরিচালিত গবেষণায় এই ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে।
সংস্থাটির প্রকাশিত ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন টুথপেস্ট: সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়কালে দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, পাইকারি বাজার ও খুচরা দোকান থেকে স্থানীয় এবং আমদানিকৃত মোট ১৯টি প্রধান ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ‘ল্যাবরেটরি অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি’ (ইএইচই)-তে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নমুনাগুলোর পরীক্ষণ ও বিশ্লেষণ চালানো হয়। ল্যাব পরীক্ষায় দেখা যায়, ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টি টুথপেস্টেই (অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ) স্পষ্ট মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, দেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতেই (৮৮ শতাংশ) প্লাস্টিক কণা উপস্থিত রয়েছে। আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে ভিয়েতনামের দুটি নমুনার দুটিতেই, থাইল্যান্ডের দুটি নমুনার একটিতে এবং ভারতের পাঁচটি নমুনার মধ্যে একটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব মিলেছে। পরীক্ষাগারে প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০টি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়েছে। সবকটি ব্র্যান্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২০টি কণা পাওয়া গেছে ‘মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেল’-এ। এছাড়া ‘ক্লোজআপ রেড হট’ ও ‘ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ’-এ ১৬০টি করে, ‘কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা’-তে ১৪০টি, ‘সিগন্যাল গ্রিন টি’-তে ১২০টি, ‘পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট’ ও ‘হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার’-এ ১০০টি করে এবং ‘সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্ট’-এ ৮০টি কণা শনাক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের জন্য বাজারজাত করা ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেই (৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি কণা। এর মধ্যে ‘কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা’ (স্ট্রবেরি), ‘মেরিল বেবি’ (স্ট্রবেরি), ‘মেরিল বেবি’ (অরেঞ্জ) ও ‘পেপসোডেন্ট কিডস’ (অরেঞ্জ) অন্যতম। অন্যদিকে, মাত্র আটটি নমুনায় কোনো শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে রয়েছে ‘প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার’, ‘জেনফ্রেশ’, ‘প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি’ (ম্যাঙ্গো), ‘সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল’, ‘কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ’, ‘ক্লোজআপ রেড হট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজি’, ‘কোডোমো’ (অরেঞ্জ) ও ‘কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট’।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে সহজে দেখা যায় না। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও দন্ত চিকিৎসকদের মতে, মুখমণ্ডল ও দাঁত হলো মানবদেহের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। দাঁত পরিষ্কার করা বা সাদা করার অজুহাতে কিংবা উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে কিছু কোম্পানি টুথপেস্টে এসব উপাদান ব্যবহার করে থাকে। ব্রাশ করার সময় দুর্ঘটনাবশত এসব প্লাস্টিক কণা পেটে চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় স্বাস্থ্য গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ফলে শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, হৃদরোগ-সংবহনতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ে। এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে প্রদাহ, কোষের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, প্রজননক্ষমতা হ্রাস এবং গর্ভস্থ ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশে বাধার কারণ হতে পারে।
সারাদেশে ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর পরিচালিত ইএসডিও-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৪২ শতাংশই টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি সম্পর্কে আগে কখনো শোনেননি এবং ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ শুনলেও বিস্তারিত জানেন না। অর্থাৎ অধিকাংশ ভোক্তাই অজান্তে প্রতিদিন এই ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা উপাদান মুখে ব্যবহার করছেন। ইএসডিও-এর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন জানান, কৃত্রিমভাবে কম খরচে পণ্যের ওজন বা কার্যকারিতা বাড়াতে এটি করা হয়, যা এক ধরনের অসদাচরণ ও ভোক্তাদের সাথে প্রতারণা। অথচ কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে এ ধরনের রাসায়নিক বা সিনথেটিক পলিমারের তথ্য উল্লেখ থাকে না।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর উপপরিচালক (রসায়ন) মো. মনজুরুল করিম জানিয়েছেন, টুথপেস্টে ব্যবহারযোগ্য অনুমোদিত ৪০টি উপাদানের তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো নাম নেই। তবে দেশে এখনো পর্যন্ত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সুনির্দিষ্ট সীমা বা নিষিদ্ধকরণের কোনো আইন নেই। বিএসটিআই জানিয়েছে, পূর্বের ফেসওয়াশ ও প্রসাধনী পণ্যের মতো এবার টুথপেস্টের জাতীয় মানদণ্ডেও সংশোধন এনে কড়া আইনি তদারকি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে দেশের অন্যতম প্রধান উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশ ও স্কয়ার টয়লেট্রিজ তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, তারা স্থানীয় সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান ও কঠোর বৈশ্বিক মান মেনেই নিরাপদ পণ্য উৎপাদন করে। তবে গবেষণার তথ্য প্রকাশের পর তারা তাদের কারিগরি দল ও থার্ড পার্টির মাধ্যমে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে এবং কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অতি দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে টুথপেস্টে কৃত্রিম মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
















