মানুষের জীবনের শুরু ও শেষ দুটোই শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন অজান্তেই অসংখ্যবার শ্বাস নেওয়া হলেও আধুনিক গবেষণা বলছে, সচেতনভাবে শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করলে তা মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বহু প্রাচীন সংস্কৃতিতে শ্বাস-প্রশ্বাসভিত্তিক নানা অনুশীলনের প্রচলন ছিল। ভারতীয় প্রাণায়াম কিংবা চীনা চিগংয়ের মতো পদ্ধতিগুলোতে মন ও শরীরের সংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয় নিয়ন্ত্রিত শ্বাসের মাধ্যমে।
গবেষকদের মতে, প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিট ধীরে ও সচেতনভাবে শ্বাস নিলেই শরীর ও স্নায়ুতন্ত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাবি লিটল বলেন, আধুনিক যুগে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম নতুন ধরনের মানসিক প্রশান্তির উপায় হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ হৃদরোগ, উদ্বেগ, হতাশা এমনকি বার্ধক্য ত্বরান্বিত করার মতো সমস্যার কারণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস শরীরের চাপ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডেভিড স্পিগেল বলেন, অনেক মানুষ খুব দ্রুত ও অগভীরভাবে শ্বাস নেন, যা শরীরে চাপের সংকেত বাড়ায়। বিশেষ করে মুখ দিয়ে দ্রুত শ্বাস নেওয়া শরীরকে বিপদের সংকেত দেয়।
তার মতে, ধীরে ও গভীরভাবে নাক দিয়ে শ্বাস নিলে শরীরের প্রশান্তি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়।
গবেষণায় কয়েকটি বিশেষ শ্বাস-প্রশ্বাস কৌশলের কার্যকারিতা উঠে এসেছে।
এর মধ্যে একটি হলো ‘চক্রাকার দীর্ঘশ্বাস পদ্ধতি’। এতে প্রথমে নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিতে হয়, তারপর আরও ছোট একটি শ্বাস নিয়ে ফুসফুস পূর্ণ করতে হয়। এরপর ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে সব বাতাস বের করে দিতে হয়। প্রতিদিন পাঁচ মিনিট এই পদ্ধতি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সহায়ক বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
আরেকটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো ‘বক্স ব্রিদিং’। এতে চার সেকেন্ড শ্বাস নেওয়া, চার সেকেন্ড ধরে রাখা, চার সেকেন্ডে শ্বাস ছাড়া এবং আবার চার সেকেন্ড বিরতি নেওয়া হয়। এই কৌশল মনোযোগ বাড়াতে ও চাপের পরিস্থিতিতে স্নায়ুকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
‘চার-সাত-আট’ পদ্ধতিতেও ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এতে চার সেকেন্ড শ্বাস নেওয়ার পর সাত সেকেন্ড ধরে রাখতে হয় এবং আট সেকেন্ডে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদ্ধতি উদ্বেগ কমাতে কার্যকর।
গবেষক গাই ফিঞ্চাম বলেন, প্রতি মিনিটে ১০ বারের কম শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস শরীরের হৃদস্পন্দন ও স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে পারে। এটি চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা বাড়ায়।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, গর্ভবতী নারী ও হাঁপানি বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টে ভোগা ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ধরনের ব্যায়াম করা উচিত নয়।
গবেষকদের মতে, প্রতিদিন মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিট সময় দিলেও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের পরামর্শ, ধীরে, নরমভাবে এবং নাক দিয়ে পেট পর্যন্ত শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে দ্রুতই পরিবর্তন অনুভব করা সম্ভব।
















