যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যদের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, শক্তিশালী হ্যালুসিনোজেনিক পদার্থ ইবোগেইন পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) মোকাবিলায় কার্যকর হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন, এটি কীভাবে কাজ করে।
ইবোগেইন মূলত আফ্রিকার ইবোগা গাছের শিকড় থেকে পাওয়া যায় এবং মধ্য-পশ্চিম আফ্রিকার কিছু আধ্যাত্মিক ও চিকিৎসা আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে এটি মাদকাসক্তি, মানসিক ট্রমা ও পিটিএসডি চিকিৎসায় সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে গবেষণায় রয়েছে। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে এটি নিষিদ্ধ।
সাবেক মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ বাহিনীর সদস্য এলিয়াস কফোরি বহু বছর ধরে যুদ্ধজনিত শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। অস্ত্রোপচার, ওষুধ ও থেরাপি কিছুই তাকে স্বস্তি দিতে পারেনি। পরে তিনি মেক্সিকোর একটি ক্লিনিকে ইবোগেইনভিত্তিক পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় অংশ নেন।
চিকিৎসার সময় তিনি অতীত স্মৃতি, মৃত আত্মীয়স্বজন ও জীবনের নানা ঘটনার অত্যন্ত জীবন্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। কফোরির ভাষায়, “মনে হচ্ছিল সবকিছু এখনই ঘটছে।”
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি-এর গবেষকেরা ৩০ জন মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সাবেক সদস্যের ওপর এই পরীক্ষা চালান। অংশগ্রহণকারীরা তিন ঘণ্টার মধ্যে শরীরের ওজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় ইবোগেইন গ্রহণ করেন। পরে গবেষকেরা পিটিএসডি, উদ্বেগ ও হতাশার লক্ষণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব অংশগ্রহণকারীর হ্যালুসিনেটরি অভিজ্ঞতা বেশি তীব্র ছিল, তাদের পিটিএসডি উপসর্গও তুলনামূলক বেশি কমেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইবোগেইন অন্য সাইকেডেলিক মাদকের মতো কাজ করে না। এটি মস্তিষ্কের এমন কিছু রিসেপ্টরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা স্নায়ুকোষের সুরক্ষামূলক আবরণ পুনর্গঠনে সাহায্য করে। এছাড়া শরীরে তৈরি হওয়া “নরইবোগেইন” নামের উপাদান সেরোটোনিন কার্যক্রম বাড়িয়ে মানসিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু গবেষকের মতে, ইবোগেইনের মূল শক্তি এর রাসায়নিক গঠনে নয়, বরং তীব্র মানসিক অভিজ্ঞতায়। অনেক রোগী চিকিৎসার সময় জীবনের পুরোনো স্মৃতি নতুনভাবে উপলব্ধি করেন, যা তাদের মানসিক পরিবর্তনে সহায়তা করে।
তবে গবেষকেরা সতর্কও করছেন। ইবোগেইন কোনো “ম্যাজিক সমাধান” নয়। সবার ক্ষেত্রে এটি সমানভাবে কার্যকর হয় না। কিছু রোগীর কোনো উন্নতি হয়নি, আবার কারও অবস্থার অবনতিও হয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা। কিছু ক্ষেত্রে ইবোগেইন হৃদ্রোগজনিত জটিলতা ও মৃত্যুর কারণ হয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঠোর চিকিৎসা তত্ত্বাবধান ছাড়া এটি ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এছাড়া গবেষণার বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে ইবোগেইনের সঙ্গে আরেক সাইকেডেলিক পদার্থ ৫-এমইও-ডিএমটি ব্যবহার করা হয়। ফলে কোন উপাদান প্রকৃতপক্ষে কতটা কাজ করছে, তা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
তারপরও যুক্তরাষ্ট্রে এই বিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে। ২০২৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাইকেডেলিক ওষুধ গবেষণার অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে নির্বাহী আদেশে সই করেন এবং ইবোগেইন গবেষণায় ৫ কোটি ডলার বরাদ্দ দেন।
কফোরির মতে, ইবোগেইন তার জীবন বদলে দিয়েছে। “মানসিকভাবে আমি যেন শান্তি ফিরে পেয়েছি,” বলেন তিনি। তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন, শুধু ওষুধ নয়—ধ্যান, ডায়েরি লেখা ও নিয়মিত মানসিক চর্চাও তার পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
















