কখনো এক সময়ে আমেরিকান বর্ণবাদের শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ থেকে পালিয়ে আসা কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য মুক্তির স্বপ্ন ছিল যে ভূমি, সেই লাইবেরিয়াই আজ যেন নতুন করে এক বেদনাদায়ক দ্বন্দ্বের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কর্তৃক বহিষ্কারের মুখে পড়া এল সালভাদরের নাগরিক কিলমার আর্মান্ডো আব্রেগো গার্সিয়াকে “মানবিক কারণে” আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছে মনরোভিয়া। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যেন লাইবেরিয়ার মানবতার ইতিহাসে এক গভীর প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
সরকার বলছে, এটি তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য—যে কেউ বিপদে পড়লে আশ্রয় দেওয়া। কিন্তু সমালোচকদের মতে, গার্সিয়াকে গ্রহণ করা মানে নিজস্ব ইতিহাসকেই অস্বীকার করা। কেননা, এই দেশ একদিন আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নিয়েছিল, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে গড়ে উঠেছিল কৃষ্ণাঙ্গদের আশ্রয়স্থল হিসেবে।
১৯ শতকের গোড়ায় ওয়াশিংটনভিত্তিক আমেরিকান কলোনাইজেশন সোসাইটি—যাদের অনেকেই ছিলেন ধনবান শ্বেতাঙ্গ প্রভাবশালী—লাইবেরিয়াকে প্রতিষ্ঠা করে এই ধারণায় যে, মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গরা দাসপ্রথার জন্য হুমকি এবং তাদের আফ্রিকায় পাঠিয়ে দেওয়াই হবে সমস্যার সমাধান। কিন্তু আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আগত মুক্ত মানুষরা সেই কৃত্রিম অনুগ্রহ প্রত্যাখ্যান করে নিজেরাই ঘোষণা করে স্বাধীন লাইবেরিয়ার জন্ম ১৮৪৭ সালে।
আজ সেই লাইবেরিয়া, যেখান থেকে মানবমুক্তির এক অনন্য ইতিহাস শুরু হয়েছিল, যেন নিজেই পরিণত হচ্ছে সেই বর্ণবাদী চক্রের সহায়কে। গার্সিয়া নিজে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে তিনি কোস্টা রিকায় যেতে চান, লাইবেরিয়ায় নয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্র তাকে পাঠাতে চায় পশ্চিম আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশে—এটি কি মানবাধিকার বা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?
এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনগত জটিলতা নয়, নৈতিকতারও এক বড় পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আফ্রিকার দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে তাদের বহিষ্কৃত নাগরিকদের গ্রহণে, তা যেন এক নতুন উপনিবেশিকতার রূপ। ইতিমধ্যে দক্ষিণ সুদান, রুয়ান্ডা, এসওয়াতিনি প্রভৃতি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এমন চাপে পড়ে বন্দি অভিবাসীদের গ্রহণ করেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়া প্রায় সব সময়েই আফ্রিকার দেশগুলোকেই লক্ষ্য করে। তাদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে নানা কূটনৈতিক সুবিধা, বাণিজ্যিক চুক্তি ও ভিসা ছাড়ের মাধ্যমে। এমনকি লাইবেরিয়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছে, যার ফলে লাইবেরিয়ানদের ভিসার মেয়াদ এক বছরের বদলে তিন বছর করা হয়েছে। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে আছে মানবতার এক গভীর আপস।
ইতিহাস বলছে, আমেরিকা কখনোই লাইবেরিয়াকে প্রকৃতভাবে সম্মান দেয়নি। স্বাধীনতা ঘোষণার পনেরো বছর পর—১৮৬২ সালে—যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয় এই দেশের সার্বভৌমত্বকে। এরপর দশকের পর দশক, আমেরিকান কোম্পানিগুলো লাইবেরিয়ার রাবার ও লৌহসম্পদ লুণ্ঠন করেছে, আর স্থানীয় প্রভুরা চুপ থেকেছেন।
আজ সেই একই শক্তি আবারো লাইবেরিয়াকে ব্যবহার করতে চাইছে নিজের বর্ণবাদী নীতির সেবায়। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে গার্সিয়ার মতো মানুষরা নিছক সংখ্যা—একটি জাতিগত ভয়ের প্রতিচ্ছবি মাত্র। অথচ লাইবেরিয়া তো সেই ভূমি, যেখানে একদিন কৃষ্ণাঙ্গরা লিখেছিল আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার ইতিহাস।
যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮০০ সালের আমলে বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো তিনিও যোগ দিতেন সেই কলোনাইজেশন সোসাইটির সভায়, যারা কৃষ্ণাঙ্গদের নিজের দেশ থেকে উৎখাত করেছিল। কিন্তু আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে, আর লাইবেরিয়া আজ এক স্বাধীন রাষ্ট্র।
এই রাষ্ট্রের উচিত মনে রাখা—তার জন্ম হয়েছিল বর্ণবাদের প্রতিবাদে, কোনো শ্বেতাঙ্গ ক্ষমতার অনুকম্পায় নয়। তাই আজ যদি সে সেই একই বর্ণবাদের প্রলেপে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়ক হয়ে ওঠে, তবে তা হবে তার ইতিহাসের প্রতি এক অমার্জনীয় বিশ্বাসঘাতকতা।
লাইবেরিয়ার অস্তিত্বের মর্মবাণী ছিল—অন্যায়ের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি, মানবতার জন্য আশ্রয়। আজ সেই মন্ত্রকেই আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ, ইতিহাস ক্ষমা করে না; ইতিহাস কেবল স্মরণ রাখে—কারা নত হয়েছিল, আর কারা দাঁড়িয়ে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
















