দুই বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিধ্বস্ত গাজার রাতগুলো আজও ভয় আর নিঃস্বতার প্রতীক। গাজার বাসিন্দা ইয়াসির শাহিন বলেন, “রাতগুলোই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। ঠোঁট শুকিয়ে যেত, বুক কাঁপত, মনে হতো আকাশ যেন আমাদের ওপর ভেঙে পড়ছে।”
এই শহর এখন ভাঙা দেয়াল, পোড়া ধ্বংসস্তূপ আর ছাইয়ে মিশে যাওয়া স্বপ্নের এক নাম। অর্থনীতি ধ্বংস, অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন, আর মানুষ গৃহহীন—একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির ছায়ায় টিকে থাকা এক ক্লান্ত জনপদ। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৬৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত, আরও প্রায় ১০ হাজার এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা।
এমন এক সময়ে, কাতারের রাজধানী দোহায় বিশ্বের নেতারা জাতিসংঘের দ্বিতীয় বিশ্ব সামাজিক উন্নয়ন সম্মেলনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—“কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে।” কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির আয়নায় গাজা আজ এক করুণ ব্যঙ্গচিত্র। যেখানে রুটি আর পানিও বিলাসিতার সমান।
মানবিক সংগঠন হিউম্যানিটি ফার্স্ট ইউকের স্থানীয় প্রধান শাহিন বলেন, “এমনও দিন আসে, যখন এক টুকরো রুটি হাতের নাগালের বাইরে মনে হয়।” যদিও যুদ্ধের সবচেয়ে খারাপ সময়ের তুলনায় দাম কিছুটা কমেছে, তবু এখনও তা ছয় থেকে দশ গুণ বেশি।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী প্রতিদিন যে সংখ্যক ট্রাক ঢোকার কথা ছিল, তার এক-চতুর্থাংশেরও কম—মাত্র ৪ হাজার ৪৫৩ ট্রাক প্রবেশ করেছে। ফলে জীবনযাত্রা প্রায় অচল।
জাতিসংঘের হিসেবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজার ৯২ শতাংশ আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ ৫৫ থেকে ৬০ মিলিয়ন টন। শাহিনের ভাষায়, “স্কুল, ক্লিনিক, দোকান, ঘরবাড়ি—জীবনের প্রতিটি আশ্রয় ধূলায় মিশে গেছে।”
দোহা সম্মেলনে ১৯৯৫ সালের কোপেনহেগেন ঘোষণার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হলেও, সেই কণ্ঠ আজ গাজার কান্নায় হারিয়ে যায়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে বলেছেন “উন্নয়নের টিকা”, কিন্তু মানবাধিকারকর্মীরা বলেন—গাজার বাস্তবতা সেই প্রতিশ্রুতির এক শীতল কবর।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনসের অ্যাডভোকেসি পরিচালক রোহান ট্যালবট জানান, “যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যখাত ভয়াবহ সংকটে। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রায় শেষ, শত শত চিকিৎসক নিহত বা আটক।”
হিউম্যানিটি ফার্স্ট ইউকের প্রধান আজিজ হাফিজ বলেন, “শান্তি ও ন্যায়বিচার ছাড়া উন্নয়ন কোনোদিন বিকশিত হতে পারে না। ঘোষণার ভাষা যতই সুন্দর হোক, তা মানুষের নিরাপত্তার অধিকারকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি পেশাগত প্রশিক্ষণ, স্কুল পুনর্গঠন, কিংবা মানসিক সহায়তা কর্মসূচি—এগুলোই হতাশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। স্থায়ী শান্তি যেমন সমৃদ্ধির মূল শর্ত, তেমনি বর্তমানের মর্যাদা রক্ষাও সমান প্রয়োজনীয়।”
ট্যালবটের মতে, “যতদিন না মানবিক আইন মানা হচ্ছে, গাজার উন্নয়ন এক মরীচিকা।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান—ইসরায়েলকে চাপ দিতে হবে যেন স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়, এবং আহতদের জন্য চিকিৎসা ও সহায়তা প্রবাহ নিশ্চিত করা যায়।
গাজার মানুষের আজকের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা—নিজ হাতে নিজেদের ঘর পুনর্নির্মাণ করা, স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। শাহিন বলেন, “বসবাস শিবিরগুলোতে থাকা এখন সবচেয়ে কষ্টের। মানুষ তাবুতে দিন কাটায়, বাতাসে তা উড়ে যায়, বৃষ্টি হলে ভিজে যায়, রোদে পুড়ে যায়—কোনো আশ্রয় নেই।”
তবে তার কাছে পুনর্গঠন মানে শুধু ইট-পাথর নয়। “এটা জীবনের পুনর্জন্ম, নিরাপত্তা আর মর্যাদার পুনর্গঠন। তারা শুধু ভবন নয়, জীবনের আলো ফিরিয়ে আনতে চায়।”
গাজার সরকারি তথ্য বলছে, যুদ্ধবিরতির পরও অন্তত ৮০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে আরও ২৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও অনেক।
ট্যালবট বলেন, “ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা ছাড়া স্থায়ী শান্তি বা উন্নয়নের কোনো পথ নেই। দোহা বা নিউইয়র্কের সম্মেলন কেবল কাগজের প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে, যদি গাজার মূল যন্ত্রণার কারণ—অবরোধ ও দখলদারিত্ব—শেষ না হয়।”
তার মতে, “ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকারই হতে হবে তাদের পুনরুদ্ধারের সূচনা।”
















