ইসরায়েলের চলমান হামলায় লেবাননের শিক্ষা ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, বহু স্কুল ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি দেশটিতে একটি “হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম” তৈরি করছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননের বহু এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কয়েক লাখ স্কুলপড়ুয়া শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করলেও তা সব শিক্ষার্থীর জন্য কার্যকর হচ্ছে না। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অনেকেরই ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ বা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে তারা শিক্ষার বাইরে পড়ে যাচ্ছে।
শিক্ষাবিদ কার্লোস নাফাহ বলেন, “একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান কাজ হলো নাগরিক তৈরি করা। কিন্তু আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে পুরো একটি প্রজন্ম হারিয়ে যাচ্ছে।”
দুই হাজার উনিশ সাল থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, মহামারি, অর্থনৈতিক সংকট এবং এখন যুদ্ধ—সব মিলিয়ে লেবাননের শিক্ষাব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এখন মূলত বিজ্ঞান ও গণিতের মতো বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত শিক্ষা উপেক্ষিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের সামাজিক ঐক্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যুদ্ধের কারণে অনেক শিশুর জীবনে স্বাভাবিকতা ভেঙে পড়েছে। তারা হারাচ্ছে নিয়মিত জীবনযাপন, বন্ধুত্ব, নিরাপত্তাবোধ ও মানসিক স্থিতি। জাতিসংঘের শিক্ষা বিষয়ক কর্মকর্তারা বলছেন, বহু শিশু মানসিক আঘাত, ভয় ও উদ্বেগ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
লেবাননের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র, পালাক্রমে ক্লাস এবং মানসিক সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। তবে অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিশুদের সংখ্যা বাড়লে শিশুশ্রম ও অল্প বয়সে বিয়ের ঘটনাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকরাও সংকটে রয়েছেন। কম বেতন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে বহু শিক্ষক পেশা বদলেছেন বা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক অন্য পেশায় চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
গবেষকরা বলছেন, লেবাননে এখন এমন এক বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে যেখানে কিছু শিশু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে, আর অন্যরা দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা বঞ্চনা, মানসিক আঘাত ও বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছে।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর জাতীয় উদ্যোগ না নেওয়া হলে এই সংকট লেবাননের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
















