ভয়াল ঘূর্ণিঝড় কালমেগি বৃহস্পতিবার ভিয়েতনামে আঘাত হেনেছে, ফিলিপাইনে তাণ্ডব চালিয়ে অন্তত ১১৪ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পর। পুরো শহরজুড়ে বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর এ ঝড় এখন ভিয়েতনামের কেন্দ্রীয় উপকূলে বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
ভিয়েতনামের সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে, উপকূলে ঘণ্টায় প্রায় ৯২ মাইল (১৪৯ কিলোমিটার) বেগে বাতাস বইছে। উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য ২ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি সৈন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ছয়টি বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, শতাধিক ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঝড়টি বর্তমানে ডাক লাক ও জিয়া লাই প্রদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। জাতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে, পরবর্তী ছয় ঘণ্টার মধ্যে সাতটি শহর ও প্রদেশের শতাধিক এলাকা বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।
দেশজুড়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল দমকায় ঘরবাড়ির ছাদ উড়ে গেছে, হোটেলের কাচ ভেঙে চুরমার হয়েছে, রাস্তায় উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছ। কোয়ি নন এলাকায় প্রধান সড়কে গাছ পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে ঝড়টি ভিয়েতনামে আঘাত হানে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক লাক প্রদেশের দুইটি গ্রাম থেকে শত শত মানুষ সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করে। বহু ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে, অনেক পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।
ভিয়েতনামের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগরে ঢেউয়ের উচ্চতা ৮ মিটার পর্যন্ত উঠতে পারে। এরই মধ্যে সেনাবাহিনী ছয়টি বিমানসহ ৬ হাজার ৭০০টিরও বেশি যান ও সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজে।
সরকারি কর্মকর্তারা উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সতর্ক করছেন। প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন এক জরুরি বৈঠকে বলেন, “আমাদের নিশ্চিত করতে হবে কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে, কারও যেন পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব না হয়। বিচ্ছিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে হবে দ্রুত।”
এর আগে ফিলিপাইনে ধ্বংসের চিহ্ন রেখে যায় ঘূর্ণিঝড়টি, যা সেখানে টিনো নামে পরিচিত। দ্বীপদেশটিতে ১১৪ জন নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেবু দ্বীপে প্রবল বৃষ্টি ও বাতাসে পুরো শহর প্লাবিত হয়ে পড়ে, রাস্তায় গাড়ি ও কনটেইনার ভেসে গেছে।
মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সেবু দ্বীপে এক মাসের সমপরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, পাহাড় ধসে শহরে নেমে এসেছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। টালিসাই শহরের বাসিন্দা মেলি সাবেরন বলেন, “আমাদের আর কোনো ঘরবাড়ি নেই। কিছুই উদ্ধার করতে পারিনি। এত তীব্র ঝড় আগে কখনও দেখিনি।”
দেশটির প্রেসিডেন্ট ফের্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বৃহস্পতিবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন, যা ব্যাপক প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষতি ও জীবিকার বিপর্যয় নির্দেশ করে। হাজার হাজার মানুষ স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।
ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও বন্যায় বিপর্যস্ত। ঐতিহাসিক শহর হুয়ে ও হোই আন প্লাবিত হয়েছে নদীর পানি উপচে পড়ায়। হোয়াই নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বাসিন্দারা এখন কাঠের নৌকায় চলাচল করছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দুই প্রদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৪ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা মাছ ধরার খামার ধ্বংস এবং নৌকা উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
প্রতিবেশী থাইল্যান্ডেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও নদীর পানি উপচে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
















