শিশুদের সুরক্ষা—এই প্রতিশ্রুতির ছায়ায় ব্রিটেনের অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট আজ পরিণত হয়েছে তথ্য দমনের শক্তিশালী অস্ত্রে। আইনের কার্যকারিতা শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই এক্স (পূর্বতন টুইটার) যুক্তরাজ্যের ব্যবহারকারীদের টাইমলাইনে গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতার ভিডিওগুলো গোপন করে দেয় সতর্কবার্তার আড়ালে। এক আইন, যা শিশুর সুরক্ষার নামে প্রণীত, সেটিই এখন মানুষের চোখ ও কণ্ঠ বন্ধ রাখার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
এই নীরবতার বীজ রোপণ হয়েছিল বহু বছর আগে, পর্নহাবের মালিকানাধীন কুখ্যাত কর ফাঁকিদাতা প্রতিষ্ঠান মাইন্ডগিকের হাত ধরে। তারা সরকারের সঙ্গে মিলে একবার “এজ আইডি” নামে পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করে, যা প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করতে পারত। তীব্র জনবিরোধিতায় সেই উদ্যোগ ভেস্তে গেলেও ধারণাটি মারা যায়নি। ডিজিটাল ইকোনমি অ্যাক্ট ২০১৭ সেই ধারণার ভিত গেঁথে দেয়, আর অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট ২০২৩ সেটিকে আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আজ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ, যেমন ফ্রান্স ও জার্মানি, একই ছাঁচে গোপনে অনুরূপ আইন প্রণয়নের পথে হাঁটছে।
এই আইনের অধীনে যুক্তরাজ্যের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক অফকম এখন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সার্চ ইঞ্জিন পর্যন্ত প্রায় সব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তদারকি করছে। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কোটি কোটি পাউন্ড জরিমানার হুমকি ঝুলছে তাদের মাথার ওপর। উইকিপিডিয়ার মতো মুক্ত জ্ঞানভাণ্ডারও আজ বিপদের মুখে। আদালত অফকমকে এটিকে “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম” হিসেবে বিবেচনা করতে অনুমতি দিয়েছে, যা মানে তথ্য সেন্সর করা কিংবা লেখকদের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করা। না মানলে ব্রিটিশদের জন্য পুরো সাইট বন্ধ করে দেওয়াও সম্ভব—অবিশ্বাস্য হলেও সত্য।
আরও বিপজ্জনক হচ্ছে এই আইনগুলোর প্রযুক্তিগত ফাঁদ। বয়স বা পরিচয় যাচাইয়ের নামে তৈরি হচ্ছে বিপুল ডেটাবেস, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য জমা হচ্ছে একত্রে। একবার যদি এগুলো হ্যাক হয়, তাহলে তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ—ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি কিংবা রাজনৈতিক শোষণের হাতিয়ার। সাম্প্রতিক ডিসকর্ড ও টি ডেটিং অ্যাপের তথ্য ফাঁস সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে পরিণত করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতা বিস্তারের নামে অভিভাবকদের দায়িত্ব নিজের হাতে নিচ্ছে। আজকের যুগে পিতামাতারা সহজেই সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন নানা টুলের মাধ্যমে। তবুও সরকার বলছে, তাদেরই শিশুদের রক্ষা করতে হবে—এ যেন স্নেহের ছদ্মবেশে নজরদারির আরেক নাম।
ব্রিটেনের এই পথ এখন অন্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করছে। ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিজিটাল আইডির সঙ্গে যুক্ত বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালুর পথে হাঁটছে। প্রথমে লক্ষ্য থাকে পর্নোগ্রাফি রোধ, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই হাত প্রসারিত হয় রাজনীতি ও সাংবাদিকতার দিকেও। আজ গাজা ভিডিও বন্ধ হচ্ছে, কাল হয়তো সংবাদ বা প্রতিবাদও মুছে যাবে।
সরকার বলছে, এটি শিশুদের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবে এটি তৈরি করছে এক নজরদারিমূলক বিশ্ব, যেখানে কথা বলার আগে পরিচয় প্রমাণ করতে হবে। শিশুদের রক্ষা নয়, এই আইনের আসল লক্ষ্য হচ্ছে নাগরিকের চিন্তা, জ্ঞান ও প্রতিবাদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
শিশু সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার, প্রযুক্তি-সচেতনতা ও পিতামাতার সক্রিয় ভূমিকা, রাষ্ট্রের নজরদারি নয়। কিন্তু ব্রিটেন ও তার অনুসারী দেশগুলো যে পথে হাঁটছে, সেখানে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠছে স্বাধীনতার কফিনে পেরেক।
যে আইনকে বলা হচ্ছে নিরাপত্তা, সেটিই আসলে সেন্সরশিপ—এমনই মন্তব্য করেছেন ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক ও গবেষক রাফায়েল সভকো গার্সিয়া। তাঁর মতে, ব্রিটেন আজ এক নতুন নীরবতার রাজত্ব গড়ছে, যেখানে “শিশু সুরক্ষা” কেবল এক মুখোশ—ভেতরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা, আর মানুষের মৌলিক অধিকারের উপর নেমে আসছে অন্ধকারের পর্দা।
















