বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ক্রমেই অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী ও খালগুলোকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক টানাপোড়েন বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিয়মকানুন বদলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশের অর্থমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের প্রস্তাব দেন। যদিও পরে সেই প্রস্তাব থেকে সরে আসা হয়, তবু এটি ইঙ্গিত দেয় যে সমুদ্রপথ এখন ক্রমেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রপথে নিরাপদ ও অবাধ চলাচলের যে নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে যে কাঠামো গড়ে উঠেছিল, সেটিই বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমানে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের বেশিরভাগই সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, বড় শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে এই পথগুলোকে ব্যবহার করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা সবচেয়ে বেশি। সেখানে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর একদিকে কিছু দেশ জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে, অন্যদিকে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে জাহাজ আটক বা তল্লাশির ঘটনা ঘটছে। এতে জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং তেলের দাম বেড়ে গেছে।
এছাড়া মধ্য আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাল নিয়েও নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে। কয়েকটি দেশ অভিযোগ করেছে, একটি শক্তিশালী দেশ ওই অঞ্চলের জাহাজগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। পাল্টা জবাবে ওই দেশ অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে এবং অন্যদের ভণ্ডামির কথা বলেছে।
অন্যদিকে ইউরোপের একটি যুদ্ধক্ষেত্র সংলগ্ন সাগর এলাকায় রপ্তানিতে বাধা দিয়ে খাদ্য সরবরাহেও প্রভাব ফেলেছে। পূর্ব এশিয়ার একটি সাগর এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজকে হয়রানির অভিযোগও উঠেছে, যা নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে।
শুধু রাষ্ট্র নয়, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও এখন সমুদ্রপথকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। কিছু এলাকায় হামলার কারণে জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নতুন কিছু নয়, তবে এখন এর ব্যাপ্তি অনেক বড় হয়ে গেছে। জাহাজের সংখ্যা, পণ্য পরিবহনের পরিমাণ এবং বৈশ্বিক নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাবও বহুগুণ বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচলের খরচ বাড়ছে, বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। এমনকি সামান্য বিলম্বও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সমুদ্রপথে চলাচল আর নির্দিষ্ট নিয়মের ওপর নির্ভর করবে না; বরং শক্তি, প্রভাব ও রাজনৈতিক দরকষাকষির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
















