লন্ডনের প্রাচীন প্রাসাদগুলোর নীরব করিডোরে যেন হাওয়া থেমে গেছে। এক সময়ের রাজপুত্র, ডিউক অব ইয়র্ক, আর্ল অব ইনভারনেস, ব্যারন কিলিলিয়েঘ—রাজপরিবারের গৌরবে ভরা নাম—অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর, এখন কেবল অ্যান্ড্রু। রাজমুকুটের আলো থেকে ছিটকে পড়েছেন, হারিয়েছেন সব উপাধি ও সম্মান।
বৃহস্পতিবার রাতে বাকিংহাম প্রাসাদ ঘোষণা দেয়, রাজা চার্লস তৃতীয় তাঁর ভাইয়ের উপাধি ও রাজকীয় মর্যাদা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। একই সঙ্গে উইন্ডসর এস্টেট থেকে তাঁকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণা অ্যান্ড্রুর দীর্ঘ পতনের এক কঠিন অধ্যায়ের পরিণতি, যার সূত্রপাত হয়েছিল যৌন অপরাধে দোষী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর বিতর্কিত সম্পর্কের কারণে।
শুক্রবার সকালেই তাঁর নাম বাদ পড়ে যায় অফিসিয়াল ‘পিয়ারেজ’ তালিকা থেকে—একজন রাজপুত্রের রাজপাট হারানোর আনুষ্ঠানিক সিলমোহর যেন।
৬৫ বছর বয়সী অ্যান্ড্রু এখনো রয়েছেন রাজপরিবারের উত্তরাধিকারসূত্রে অষ্টম স্থানে, কিন্তু তাঁর শিরোপা, প্রতিপত্তি, গৌরব—সবই এখন অতীত।
প্রাসাদের ঘন দেয়ালের বাইরে, প্রশ্ন ঘুরছে এখন তিনি কোথায় থাকবেন, কেমন হবে তাঁর জীবন, আর রাজপরিবারের এই কঠোর পদক্ষেপ কি আদৌ প্রশমিত করবে ব্রিটিশ জনমতের ক্ষোভ?
বলা হচ্ছে, আপাতত তিনি থাকবেন উইন্ডসরের রয়্যাল লজে—ত্রিশ কক্ষের রাজকীয় অট্টালিকা, যেখানে তিনি ২০০৩ সাল থেকে বসবাস করছেন। তবে প্রাসাদ জানিয়েছে, তাঁকে এখন সেই বাসস্থানও ছাড়তে হবে। ভবিষ্যতে তাঁকে দেওয়া হবে রাজা চার্লসের ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্যান্ড্রিংহামের একটি বাড়ি—যেখানে রাজপরিবার প্রতি বছর বড়দিন উদযাপন করে।
অ্যান্ড্রুর আয় ও সম্পদ সবসময়ই রহস্যে ঢাকা। জানা যায়, তিনি সামরিক সেবার পেনশন হিসেবে বছরে প্রায় ২০ হাজার পাউন্ড পান। এক সময় রানি এলিজাবেথ দ্বিতীয় তাঁকে বছরে প্রায় ১০ লক্ষ পাউন্ড ভাতা দিতেন, যা পরবর্তীতে চার্লস বন্ধ করে দেন। তবুও শোনা যাচ্ছে, অ্যান্ড্রু কিছু আর্থিক সহায়তা পাবেন তাঁর ভাই রাজা চার্লসের কাছ থেকে।
ব্যক্তিগত জীবনে অ্যান্ড্রু ও তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী সারা ফার্গুসন বহু বছর ধরে একসঙ্গে রয়্যাল লজে থাকতেন। তবে এখন তিনি নিজের নামে ফিরে গেছেন এবং আলাদা বসবাসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের দুই কন্যা—প্রিন্সেস বিয়াট্রিস ও ইউজেনি—তাদের রাজকীয় উপাধি ধরে রাখবেন, কারণ তাঁরা রাজপরিবারের সরাসরি উত্তরসূরি।
অন্যদিকে, রাজনীতির অঙ্গনেও অ্যান্ড্রুকে ঘিরে চলছে বিতর্ক। লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা চাইছে, তিনি যেন পার্লামেন্টে হাজির হয়ে তাঁর আর্থিক লেনদেন ও রাজকীয় বাসস্থানের ভাড়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন।
সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রজাতন্ত্রপন্থী সংগঠন ‘রিপাবলিক’। তাদের দাবি, সরকার ও পুলিশ যদি নীরব থাকে, তবে তারা নিজেরাই অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগে ব্যক্তিগত মামলা করবে।
অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে জীবিত থাকলে হয়তো আজ একরাশ স্বস্তি পেতেন। তাঁর পরিবার বলেছে, “আজ তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই বলতেন—আমি পেরেছি, আমি অপরাধীকে জবাব দিয়েছি।”
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এই শাস্তি কি যথেষ্ট? জনমত বলছে না। এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটিশ জনগণের ৯১ শতাংশের দৃষ্টিতে অ্যান্ড্রু এখন এক অপছন্দনীয় নাম। রাজপরিবার বারবার চেষ্টা করেও থামাতে পারেনি তাঁর কেলেঙ্কারির ধাক্কা।
আজ তিনি আর প্রিন্স নন, কেবল অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর—রাজগৌরব থেকে নির্বাসিত এক মানুষ, যিনি প্রাসাদের ছায়া থেকে নেমে এসেছেন ইতিহাসের আলো–আঁধারিতে।
















