একসময় তারা বিশ্বাস করেছিল আমেরিকার পথে খুলবে ভাগ্যের দরজা। কিন্তু এখন সেই পথই ফিরিয়ে দিয়েছে অপমান, ঋণ আর ভাঙা স্বপ্নের ভার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্প্রতি ফেরত পাঠানো ৫৪ জন ভারতীয় অভিবাসীর গল্প যেন এক করুণ কাব্য—স্বপ্ন দেখার অপরাধে জীবনের সমস্ত আলো নিভে গেছে তাদের।
রবিবার দিল্লিতে অবতরণ করেন এই ৫৪ জন পুরুষ, সবাই হরিয়ানার বাসিন্দা। তারা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছিলেন berপ্রসিদ্ধ “ডঙ্কি রুট” বা দালালচক্রের বিপজ্জনক পথে—যেখানে সীমান্তের পর সীমান্ত পেরিয়ে পা দিতে হয় মৃত্যুর দোরগোড়ায়। বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। দেশে ফিরে এখন তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা।
কৃষক হরজিন্দর সিং, চার বছর আগে আমেরিকার টিকিট কিনেছিলেন ৩৫ লাখ রুপি খরচ করে। সন্তানদের জন্য ভালো জীবনের আশায় তিনি সেখানকার এক রেস্টুরেন্টে রাঁধুনির কাজ নেন। কিন্তু আজ তাঁর মুখে শুধু আফসোসের সুর—“সব আশা শেষ হয়ে গেছে, অপমানের সেই মুহূর্তগুলো আমি ভুলতে পারব না।” তাঁর সঞ্চয়ের সব শেষ, সন্তানদের মুখের হাসি কোথায় হারিয়ে গেছে, সে প্রশ্নই এখন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
আরেকজন, নরেশ কুমার, বিক্রি করেছেন জমি, দিয়েছেন ৫৭ লাখ রুপি দালালদের হাতে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ব্রাজিল হয়ে যাত্রা শুরু, সেখান থেকে নানা দেশ পেরিয়ে তিনি পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু নতুন জীবনের সূচনা হওয়ার আগেই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার। “১৪ মাস জেলে ছিলাম, তারপর দেশে ফেরত পাঠাল,” বললেন নরেশ, মুখে তিক্ত হাসি।
কারনাল জেলার রাজত পাল জানান, পানামা হয়ে তাঁর যাত্রা ছিল মৃত্যুর সঙ্গে দৌড়ের মতো। “জঙ্গল, নদী, নৌকা, পাহাড়—সব কিছুই পার হতে হয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তে ছিল ভয়।” ডিসেম্বর মাসে পৌঁছাতে পেরেছিলেন আমেরিকায়, কিন্তু সুখের মুখ দেখার আগেই সব শেষ।
পুলিশ জানিয়েছে, কেউই এখনও দালালদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি। তবে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২,৪১৭ জন ভারতীয়কে ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিপূর্বেই সতর্ক করেছিলেন—ভুয়া এজেন্টদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও বিদেশে সহজ জীবনের প্রলোভনে তরুণরা যেন আর না ঝাঁপ দেয় অনিশ্চিত মৃত্যুর পথে।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রে তিন দশক ধরে বসবাসকারী ৭৩ বছর বয়সী হরজিত কউরকে ফেরত পাঠানোয় শিখ সমাজে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছিল। এমনকি এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১০০ জনেরও বেশি ভারতীয় নাগরিককে সামরিক বিমানে হাতকড়া পরিয়ে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭ লাখ ২৫ হাজার অবৈধ ভারতীয় অভিবাসী বসবাস করছিলেন—সংখ্যায় তারা তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী, মেক্সিকো ও এল সালভাদরের পরই অবস্থান।
কাইথালের গ্রামগুলোয় এখন সন্ধ্যা নামে এক অন্যরকম নীরবতায়। ঘরে ফেরত ছেলেরা আর আগের মতো হাসে না। তারা জানে, তাদের চোখে যে স্বপ্ন ছিল—সেটি আটলান্টিকের ওপারে নয়, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সেই “ডঙ্কি রুট”-এর ধূলোর নিচে।
















