ডব্লিউএইচও-র ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’ সতর্কবার্তা ও অভিভাবকদের করণীয়; প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও বিকল্প বিনোদনে গুরুত্ব
বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনলাইন গেমিং আসক্তি, যা বিশেষ করে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক বিকাশে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইতোমধ্যে এই আসক্তিকে ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’ বা একটি গুরুতর মনঃস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব ক্রমশ প্রকট হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি পারিবারিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারনেটে সহজলভ্য গেমগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যা মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে ব্যবহারকারীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে আটকে রাখে। ফলে পড়াশোনা, সামাজিক যোগাযোগ এবং শারীরিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে আগামী প্রজন্ম।
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সন্তানের এই আসক্তি শনাক্ত করা। যদি দেখা যায় কোনো শিশু গেম খেলা নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তিত থাকে, গেম বন্ধ করলে খিটখিটে মেজাজ বা আক্রমণাত্মক আচরণ করে, ঘুমের সময় কমিয়ে দেয় কিংবা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্যাভ্যাসে অবহেলা শুরু করে—তবে বুঝতে হবে সে গুরুতর আসক্তিতে ভুগছে। এছাড়া ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের চোখের সমস্যা, পিঠে ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন গেমিংয়ের মাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করায় সাইবার বুলিং ও আর্থিক প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে, যা শিশু নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিশাল হুমকি।
অনলাইন গেমিংয়ের এই মরণনেশা থেকে মুক্তি পেতে কঠোর শাসনের বদলে মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। প্রথমত, সন্তানদের জন্য ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। খাবার টেবিল বা শোবার ঘরে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস রাখা যাবে না। দ্বিতীয়ত, সন্তানদের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানো এবং তাদের খেলাধুলা, ছবি আঁকা বা বই পড়ার মতো সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা জরুরি। স্কুলগুলোতেও গেমিং আসক্তির কুফল সম্পর্কে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা প্রয়োজন। যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে দেরি না করে অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সিলরের সহায়তা নেওয়া শ্রেয়। সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশব নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং অভিভাবকদের সচেতনতাই হতে পারে এই সংকটের প্রধান সমাধান।
















