মার্কিন চলচ্চিত্র দ্য মাস্টারমাইন্ড-এর গল্পটি শুরু হয় এক ব্যর্থ শিল্পকর্ম চুরির ঘটনা দিয়ে। জোশ ও’কনর অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি অনুপ্রাণিত হয়েছে ১৯৭০-এর দশকের একাধিক বাস্তব চুরির ঘটনার সূত্রে—যে সময়টিকে ইতিহাসে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দশক বলা হয়।
১৯৭২ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের উরচেস্টার আর্ট মিউজিয়ামে দুই ব্যক্তি প্রবেশ করে চারটি মূল্যবান চিত্রকর্ম চুরি করে নিয়ে যায়—পল গগাঁ, পাবলো পিকাসো ও এক সময় রেমব্রান্ট হিসেবে ধরা হওয়া একটি ছবিসহ। এই ঘটনায় এক নিরাপত্তাকর্মী গুলিবিদ্ধ হন এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। ছবিগুলোর দাম ধরা হয়েছিল প্রায় ২০ লাখ ডলার। নিউইয়র্ক টাইমস একে “আধুনিক সময়ের অন্যতম বড় আর্ট রবারি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। পরবর্তীতে এটি বোস্টনের বিখ্যাত ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়ামের ১৯৯০ সালের ৫০ কোটি ডলারের চুরির ঘটনাকেও প্রভাবিত করেছিল বলে ধারণা করা হয়।
এই ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন অপরাধী ফ্লোরিয়ান “আল” মানডে। তবে তার ভাড়া করা সহযোগীরা স্থানীয় বারে ঘটনাটি নিয়ে গর্ব করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। মাত্র এক মাসের মধ্যেই চুরি হওয়া ছবিগুলো উদ্ধার হয় রোড আইল্যান্ডের একটি খামার থেকে।
চলচ্চিত্রের নির্মাতা কেলি রাইকার্ট বিবিসিকে জানান, “মানডে একসময় গায়ক ছিলেন, এখনো তার রেকর্ড আমার কাছে আছে।” তিনি জানান, ‘দ্য মাস্টারমাইন্ড’ নির্মাণের সময় তিনি উরচেস্টার ঘটনার ৫০ বছর পূর্তি নিয়ে লেখা এক প্রতিবেদন পড়ে অনুপ্রাণিত হন।
চলচ্চিত্রটিতে ও’কনর অভিনয় করেছেন জেবি মুনি নামে এক মধ্যবিত্ত শিল্পবিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া তরুণের চরিত্রে, যিনি পরবর্তীতে চোরে পরিণত হন। বেকারত্ব ও পরিবারের চাপ তাকে বাধ্য করে মিউজিয়াম লুটের পরিকল্পনা করতে। কিন্তু শুরু থেকেই পরিকল্পনাটি বিপর্যয়ের দিকে গড়ায়—কারণ চুরি করা ছবিগুলো বিক্রি করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
রাইকার্ট বলেন, “যখন গল্পের ক্ষুদ্র খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেন, তখনই চুরির রোমাঞ্চ হারিয়ে যায়। বিষয়টি নিজেরাই অগ্ল্যামারাস হয়ে ওঠে।”
১৯৭০-এর দশকে শিল্পকর্ম চুরির ঢেউ কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একই বছর কানাডার মন্ট্রিয়েল মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস থেকেও ২০ লাখ ডলারের চিত্রকর্ম ও অলংকার চুরি হয়, যা সে সময় কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডাকাতি ছিল। ১৯৭৬ সালে ফ্রান্সের পালেস দে পাপে প্রদর্শনী থেকেও পিকাসোর ১১৯টি চিত্রকর্ম চুরি হয়।
এরপর আসে ১৯৭৪ সালের ঘটনা—অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থী ও উত্তরাধিকারিণী রোজ ডাগডেল আইআরএর সহযোগিতায় আয়ারল্যান্ডের রাসবারো হাউস থেকে ভেরমিয়ার ও রুবেনসসহ ১৯টি চিত্রকর্ম চুরি করেন বন্দি আইআরএ সদস্যদের মুক্তির দাবিতে।
তবে ইতিহাসে শিল্পচুরি নতুন কিছু নয়। ১৪৭৩ সালে দস্যুরা হান্স মেমলিংয়ের দ্য লাস্ট জাজমেন্ট চুরি করেছিল, আর ১৯১১ সালে ল্যুভর থেকে মোনালিসা চুরি করে নিয়েছিলেন প্রাক্তন কর্মচারী ভিনসেঞ্জো পেরুজিয়া।
তবুও ১৯৭২ সালের উরচেস্টার ঘটনার পর শিল্পচুরির ধরণে এক বড় পরিবর্তন আসে। শিল্প ইতিহাসবিদ টম ফ্লিন বলেন, “৭০-এর দশকে আর্ট মার্কেটের বাণিজ্যিক উত্থানই এই চুরির পেছনে মূল কারণ।” তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, “১৯৭৭ সালে বিবিসির অ্যান্টিকস রোডশো শুরু হওয়ার পর মানুষ প্রথমবারের মতো শিল্পকর্মকে টাকার সমতুল্য সম্পদ হিসেবে ভাবতে শুরু করে।”
সেই সময় অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজেট ঘাটতির কারণে জাদুঘরগুলোয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। তাই চোরদের কাছে এগুলো সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, সিনেমা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে চোরদের এক রোমাঞ্চকর, বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্র হিসেবে দেখানোও এই প্রবণতাকে বাড়ায়। ১৯৬০-এর দশকে টপকাপি বা হাউ টু স্টিল আ মিলিয়ন–এর মতো চলচ্চিত্রে আর্ট থিফদের দেখানো হয় চিত্তাকর্ষক বীর হিসেবে।
ইতিহাসবিদ সুসান রোনাল্ড বলেন, “এই চরিত্রগুলোর জনপ্রিয়তার কারণ হলো তারা প্রতিষ্ঠানবিরোধী, অথচ ব্যক্তিগত ক্ষতি করে না। তাই দর্শকের চোখে তারা অনেকটা বিদ্রোহীর মতো।”
রাইকার্ট অবশ্য নিজের চলচ্চিত্রে এই ভাবমূর্তি ভেঙে দিতে চেয়েছেন। তার মতে, “এই চোরেরা আসলে আত্মকেন্দ্রিক পুরুষ, যাদের স্বাধীনতা সমাজের ওপর চাপ ফেলে।”
আজকাল বড় জাদুঘরে চুরি অনেক কমে গেছে। শিল্পকর্ম বিক্রি করা এখন প্রায় অসম্ভব, কারণ এগুলো “অপরিবর্তনযোগ্য সম্পদ”। তবে যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বাজেট সংকোচন ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
যেমনটা ঐতিহাসিক ভার্নন র্যাপলে বলেন, “এখন কেবল নিরাপত্তাই নয়, ভবনের গঠনগত দুর্বলতাও শিল্পকর্মের জন্য হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তনই এখন অপরাধীর চেয়েও বড় বিপদ।”
‘দ্য মাস্টারমাইন্ড’ যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেয়েছে ১৭ অক্টোবর, আর যুক্তরাজ্যে মুক্তি পাবে ২৪ অক্টোবর।
















