২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন কেবল একটি সামাজিক বিদ্রোহ ছিল না, এটি দেশের রাজনীতি ও ক্ষমতা কাঠামোতে একটি গভীর পরিবর্তন এনেছিল। প্রাথমিকভাবে কোটা সংস্কার, শিক্ষা সুবিধা এবং সামাজিক বঞ্চনার প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুতই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং তার ব্যাপকতা লাভ করে। এই গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সফলতার পেছনে দুটি উপাদান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তি এবং সশস্ত্র বাহিনীর (সক্রিয় ও অবসরপ্রাপ্ত উভয়ই) নিরপেক্ষতা ও অনুকূল অবস্থান।
এই কলামে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তি হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার বিশ্লেষণ করা হলো।
আন্দোলনের পটভূমি ও বিস্তৃতি:
শিক্ষাক্ষেত্রের কোটা নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুতই রাষ্ট্রের ‘বিচারহীনতা’ ও ‘অন্যায়’-এর বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। ছাত্ররা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তাদের আন্দোলন কলেজ, মাদ্রাসা এবং সাধারণ মানুষের মাঝেও বিস্তার লাভ করে। এই সময়ে আন্দোলনের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল ক্ষমতায় থাকা সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অবস্থান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া। সাধারণত এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে ‘জনগণ বনাম বাহিনী’র একটি বৈরী ধারণা সৃষ্টি হলেও, জুলাই আন্দোলনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা সেই চিরাচরিত ধারণাকে বদলে দিয়েছিল।
সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত:
রাষ্ট্রীয় মেশিনের একটি স্থায়ী শক্তি হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান ও সিদ্ধান্তই আন্দোলনের গতিপথ ও পরিণতি নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সামরিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাহিনীর ভূমিকা তিনটি স্তরে বিভক্ত ছিল:
১. অবসরপ্রাপ্তদের কণ্ঠস্বর: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্যরা শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে থাকেন— “মানুষের বিরুদ্ধে আমাদের অস্ত্র চালু থাকবে না।” একটি প্রেস কনফারেন্সে এই মনোভাব স্পষ্ট করা হয়, যেখানে বলা হয় প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক ‘সন্তানের মতো’।
২. সক্রিয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা: সক্রিয় বাহিনীর সদস্যরা সরাসরি আন্দোলনে অংশ না নিলেও, তারা দমনকারী বা অসংশ্লিষ্ট শক্তি হিসেবে অগ্রসর হননি। বরং, তারা ‘সাধারণ ছাত্র-জনতার সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় না যাওয়ার’ সিদ্ধান্ত নেন। এই কৌশলগত নিরপেক্ষতা আন্দোলনকারীদের সাহস ও শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৩. মানবিক ও সামাজিক সহযোগিতা: আন্দোলনের সময় সশস্ত্র বাহিনী মানবিক সহায়তাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করার পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা সহায়তা দেয়। ডেইলি অবজারভারের একটি সংবাদে বলা হয়, সেনাবাহিনী ২৫০০-এর বেশি আহত ছাত্র-ছাত্রীকে চিকিৎসা দিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো আন্দোলনে জনগণের আস্থা বাড়ায় এবং একটি ইতিবাচক ‘নিরাপত্তা অংশীদার’ মডেল তৈরি করে।
কেন এই ভূমিকা নির্ধারণী হলো?
সাধারণ আন্দোলনকারীরা যখন রাস্তায় নামেন, তখন তাদের সবচেয়ে বড় ভয় থাকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বলপ্রয়োগ। কিন্তু যখন রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তি দমনের পথ ছেড়ে নিরপেক্ষতা বা সহযোগিতার পথ নেয়, তখন আন্দোলনকারীরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে যে ‘শিক্ষার্থীদের পক্ষেই রয়েছে রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তি’। এই অনুকূল মনোভাব আন্দোলনকে কেবল কর্মসূচি নয়, বরং প্রকৃত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়। সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার গতানুগতিক মডেলটি অকার্যকর হয়ে যায়।
পরিবর্তনের ধরণ ও পরিণতি:
এই আন্দোলন একপর্যায়ে কোটা সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে ‘সরকার পরিবর্তন’-এর দাবিতে রূপ নেয়। সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষ ও অনুকূল অবস্থান রাষ্ট্র এবং জনগণ উভয়ের মধ্যে এই অবিচ্ছিন্ন বার্তা পাঠায় যে, অহিংস গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা প্রয়োগ করে দমন করার দিন শেষ।
এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, বাহিনীর নিরপেক্ষ থাকার শক্তি এক উত্তাল পরিস্থিতিকে ধ্বংসের বদলে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। আন্দোলনের সফলতা কেবল র্যালি বা বিক্ষোভের কারণে নয়, বরং রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ ও সিদ্ধান্তের কারণে সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে বাহিনীর রাজনৈতিক সম্পর্ক ও জনবিশ্বাস বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দেখিয়েছে যে, রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তি যদি জনগণের পাশে দাঁড়ায়, তবে ইতিহাস বদলে যেতে পারে এবং দমন-পীড়নের বদলে সহযোগিতা ও বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে একটি নতুন মডেল তৈরি হতে পারে।















