দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তান সম্প্রতি কিছু কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য আলোচনায় অংশগ্রহণ, এবং গাজা শান্তি সম্মেলনে দৃশ্যমান উপস্থিতি—এসব অনেকের কাছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির এক “নতুন যুগ”-এর সূচনা বলে মনে হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো মৌলিক পরিবর্তন নয়; বরং এক ধরনের কৌশলগত মোড় নেওয়া, যা এসেছে প্রয়োজন ও চাপের সম্মিলনে।
গত মাসে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, এক পক্ষের ওপর আক্রমণ হলে অন্য পক্ষ তা নিজেদের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করবে। এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ভারসাম্যের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সময়ে ইসলামাবাদ বিরল খনিজের নমুনা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে এবং রপ্তানি চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। ওয়াশিংটনও আবার পাকিস্তানকে আঞ্চলিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
তবে এই অগ্রগতি আকস্মিক নয়। বরং এটি এসেছে আফগানিস্তান, ভারত ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতার জটিল সংমিশ্রণ থেকে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ত্যাগ পাকিস্তানকে নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক করেছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর অঞ্চলটি একধরনের কৌশলগত শূন্যতায় পড়ে। শত্রুভাবাপন্ন ইরান ও শক্তিশালী তালেবান সরকারের মাঝখানে পাকিস্তান এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একমাত্র সম্ভাব্য সহযোগী, যার ভৌগোলিক অবস্থান, গোয়েন্দা সংযোগ ও অভিজ্ঞতা ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের অস্বস্তিও পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। গত এক দশকে ওয়াশিংটন নয়াদিল্লিকে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে যুক্ত করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য, ভিসা ও রাশিয়া-সম্পর্কিত বিষয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বেইজিং সফর এবং “মেক ইন ইন্ডিয়া” কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানকে আবারও একটি “ভারসাম্যের প্রতিপক্ষ” হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।
তৃতীয়ত, পাকিস্তানের “খনিজ কূটনীতি” এখন পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি প্রধান চালক। বেলুচিস্তানের বিরল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইছে ইসলামাবাদ। তবে এই প্রচেষ্টা নতুন করে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। বেলুচিস্তান মাইনস অ্যান্ড মিনারেলস অ্যাক্ট ২০২৫ পাসের পর প্রদেশের ক্ষমতা সীমিত হয়ে গেছে, কারণ কেন্দ্র এখন খনিজ নীতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। স্থানীয় দলগুলো অভিযোগ করছে, এটি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ। এমনকি ধর্মভিত্তিক দলগুলোও এই আইনের বিরোধিতা করছে, কারণ এটি স্থানীয় জনগণের সম্পদ ব্যবহারে বঞ্চনা বাড়াবে বলে তাদের আশঙ্কা।
বেলুচিস্তানে জুড়ে শোষণ ও বৈষম্যের ইতিহাস রয়েছে। সেখানে বিনিয়োগ বাড়লেও স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নত হয়নি। অনেক বিমানবন্দর ও অবকাঠামো প্রকল্প এখনো অচল পড়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো মানে নতুন করে ক্ষোভ উসকে দেওয়া, যা বিদ্রোহী কার্যক্রমকেও ত্বরান্বিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির এই “নতুন গতি” আসলে টিকে থাকার কৌশল। আফগানিস্তানের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের জটিলতা, ও খনিজ সম্পদের লোভ—সবই ইসলামাবাদকে চাপের মুখে দিক বদলাতে বাধ্য করেছে। কিন্তু এ পরিবর্তন ভেতরের দুর্বলতাগুলো ঢাকতে পারছে না।
ওয়াশিংটন তার কৌশল পাল্টালে পাকিস্তান আবারও উপেক্ষিত হতে পারে। ভারতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব টিকে থাকবে, আর বেলুচিস্তানের ক্ষোভ আরও গভীর হবে যদি সম্পদ চুক্তিগুলোতে ন্যায়সংগত অংশীদারি নিশ্চিত না হয়।
রিয়াদে করতালি, গাজা সম্মেলনে দৃশ্যমান কূটনীতি বা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ করমর্দন—এসব পাকিস্তানের কৌশলগত পুনর্জন্ম নয়। এটি চাপের মুখে সাময়িক কূটনৈতিক অভিযোজন।
অবশেষে প্রশ্নটা ঘুরে আসে ঘরোয়া বাস্তবতায়। শাসনব্যর্থতা, বৈষম্য ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস না কাটলে কোনো বিদেশি চুক্তিই স্থায়ী সাফল্য এনে দিতে পারবে না। প্রকৃত পুনর্জাগরণ পাকিস্তানের দরকার ভেতর থেকে—বিদেশে নয়।
















