কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে একের পর এক মৃত কচ্ছপ ভেসে আসছে।
গত দুই মাসে অন্তত ৭০টি মৃত কচ্ছপ ভেসে এসেছে। এসব কচ্ছপের বেশির ভাগের পেটে ডিমের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বালিয়াড়িতে পড়ে থাকা এসব কচ্ছপের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। স্থানীয় জেলেরা বলছেন, বড় ট্রলার ও ট্রলিং জাহাজের আঘাত এবং মাছ ধরার জালে আটকে শ্বাসরোধই কচ্ছপ মৃত্যুর প্রধান কারণ।
স্থানীয় মৎস্যজীবী শাহজালাল বলেন, ‘জালে আটকে পড়লে অনেক সময় কচ্ছপের ডানা কেটে ফেলা হয়। এতে দুর্বল হয়ে তারা কূলে এসে মারা যায়।’ আরেক জেলে মনির আহমেদ জানান, গত এক সপ্তাহে সাগরে শতাধিক মৃত কচ্ছপ ভাসতে দেখা গেছে। বড় ট্রলারের জালে আটকে শ্বাস নিতে না পেরে মারা যাওয়ার ঘটনাই বেশি।
গত চার বছর সোনারপাড়ায় কচ্ছপের ডিম সংরক্ষণে কাজ করেন নবী হোসেন। তিনি জানান, এক সপ্তাহে প্রায় ২০টি মৃত কচ্ছপ কবর দিতে হয়েছে। মৃত কচ্ছপ খোলা অবস্থায় ফেলে রাখলে দুর্গন্ধ ছড়ায় ও শিশুদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ডিম দিতে এসে একের পর এক মা-কচ্ছপ প্রাণ হারাচ্ছে।’
রেডিয়েন্ট রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের গবেষক মো. আব্দুল কাইয়ুম জানান, গত দুই মাসে ৬০-৭০টি মৃত কচ্ছপ উপকূলে ভেসে এসেছে। বিশেষ করে সোনাদিয়া দ্বীপ, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এলাকায় মৃত্যুর ঘটনা বেশি। গত বছর মৃত কচ্ছপ উদ্ধারের সংখ্যা ছিল ২০০টির বেশি। ডিম পাড়ার মৌসুমে জালে আটকা পড়া বা ট্রলারের আঘাতে গুরুতর জখম হওয়াই কচ্ছপের মৃত্যুর প্রধান কারণ। আইন প্রয়োগ, মোবাইল কোর্ট ও জেলেদের সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ‘সামুদ্রিক কচ্ছপ সমুদ্রের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কচ্ছপ মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে, যা গভীর উদ্বেগের।’
বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায়ও প্রতি বছর মৃত কচ্ছপের সংখ্যা বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোনাদিয়া দ্বীপে একটি সংরক্ষণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে একাধিক হ্যাচারি স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দক্ষিণপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও পূর্বপাড়ায় অন্তত দুটি স্থানে ডিম নিরাপদে সংরক্ষণ ও ফুটানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি একজন গার্ড নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
গবেষক ও পরিবেশ কর্মীদের মতে, সামুদ্রিক কচ্ছপ টিকে থাকলে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় থাকে, জেলিফিশের আধিক্য কমে এবং মাছের উৎপাদন বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে যা জেলেদেরই উপকারে আসে। তাই সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা—এ তিন পথেই মিলতে পারে কচ্ছপ রক্ষার সমাধান।
















