রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উদ্দেশে কঠোর বার্তা ছুড়ে দিলেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি—“আমরা তোমার সাবমেরিন শিকার করছি।”
তাঁর এই সতর্কবাণী যেন উত্তর আটলান্টিকের শীতল ঢেউয়ের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল গোটা ইউরোপজুড়ে।
হিলির ভাষায়, রাশিয়ান জাহাজের গতিবিধি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ৩০ শতাংশ বেড়েছে, যা “রুশ আগ্রাসনের নতুন মুখ।” তিনি বলেন, “এ শুধু ইউক্রেন নয়—পুরো ইউরোপ এখন সেই ছায়ার নিচে।”
ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উত্তর আটলান্টিকে রাশিয়ান সাবমেরিন কার্যক্রম এখন ঠান্ডা যুদ্ধকালীন মাত্রায় ফিরে এসেছে। ফলে রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF) ও রয়্যাল নেভি প্রায় প্রতিদিন টহল জোরদার করছে—কখনও দিনরাতের ব্যবধান ছাড়াই, আবার কখনও ন্যাটো মিত্রদের সহায়তায় আকাশে ও সাগরে একযোগে।
বিবিসি নিউজ সম্প্রতি হিলির সঙ্গে উড়েছে ব্রিটেনের নতুন পি-৮ প্যাট্রোল বিমানে—যা মূলত আকাশে ভাসমান এক গুপ্তচর ঘাঁটি। ভিতরে পর্দার সারি, সেন্সর, শ্রবণযন্ত্র, আর নজরদারির অজস্র চোখ। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে সাধারণ এক ধূসর বিমানের মতো, কিন্তু এর শরীরে লুকানো আছে বোয়িং ৭৩৭-এর কাঠামো আর ভেতরে সমুদ্রের গভীরতা শুনতে পারা যন্ত্রের জগৎ।
এই বিমানের ভিতরে দাঁড়িয়ে হিলি বলেন, “রাশিয়া আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছে, আমাদের চ্যালেঞ্জ করছে। কিন্তু এই আকাশ থেকে আমরাও তাদের চোখে চোখ রেখে বলছি—আমরা তোমাদের দেখছি, পুতিন; আমরা তোমার সাবমেরিন খুঁজে ফিরছি।”
প্রথমে বিমানের ক্যামেরা পৃষ্ঠে ভাসমান বিভিন্ন জাহাজ শনাক্ত করে। তাদের সরঞ্জাম আর গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয় সন্দেহজনক কোনো ইঙ্গিতের খোঁজে। কখনও কখনও সমুদ্রের মাত্র কয়েকশ মিটার ওপরে উড়ে চলে এই ধূসর পাখি।
গত বছর, রয়্যাল নেভির সহায়তায়, একটি পি-৮ শনাক্ত করেছিল রুশ গুপ্তজাহাজ ইয়ান্তারকে, যা আইরিশ সাগরের নিচের যোগাযোগ কেবলগুলির উপর ভাসছিল বলে জানা যায়। পশ্চিমা দেশগুলো আশঙ্কা করছে—রাশিয়া হয়তো এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলের কেবল কেটে যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে, যা হবে আধুনিক যুগের নীরব যুদ্ধ—একটি “হাইব্রিড আক্রমণ।”
এরপর মিশনের গতি বদলে যায়—শুরু হয় সাবমেরিন অনুসন্ধান। বিমানের পশ্চাতে সাজানো ১২৯টি সক্রিয় ও প্যাসিভ সোনার বয়া, যেগুলো জলে নিক্ষেপ করে শব্দ শনাক্ত করা হয়। বায়ুতে একধরনের ‘পপ’ শব্দ—তারপর সেই বয়া প্যারাশুটে ভেসে নামে নীল সমুদ্রের বুকে। টর্পেডোগুলো এইবার নিষ্ক্রিয়, কিন্তু উপস্থিতির নিঃশব্দ হুমকি থেকে যায় আকাশে।
দলের একজন সদস্য বলেন, “সাবমেরিন খুঁজে বের করা সবসময় সহজ নয়। কিন্তু রুশ সাবমেরিনের নিজস্ব শব্দ আমরা চিনি।” সেই খোঁজে তারা যুক্ত থাকে সমুদ্রতলের বিশাল সেন্সর নেটওয়ার্কের সঙ্গে। আগস্টে ব্রিটিশ, মার্কিন ও নরওয়েজীয় পি-৮ একত্রে নজর রেখেছিল এক রুশ সাবমেরিনে, যা মার্কিন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে অনুসরণ করছিল।
এই মিশনে যুক্ত ছিলেন জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্তোরিয়াসও। জার্মানি নিজস্ব আটটি পি-৮ বিমান কেনার পরিকল্পনা করেছে এবং তারা শীঘ্রই স্কটল্যান্ডের আরএএফ লসি মাউথ ঘাঁটি থেকে টহল চালাবে।
পিস্তোরিয়াস বলেন, “উত্তর আটলান্টিক আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রুশ পারমাণবিক সাবমেরিনের কারণে এটি হুমকির মুখে। তাই জানতে হবে সমুদ্রের গভীরে কী ঘটছে।”
গত বছর স্বাক্ষরিত ‘ট্রিনিটি হাউস’ চুক্তির পর দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ব্রিটেন এখন জার্মানির সঙ্গে মিলে নতুন ট্যাঙ্ক তৈরি করছে, আর জার্মানি কিনছে ব্রিটিশ নির্মিত স্টিং রে টর্পেডো। তারা একসঙ্গে কাজ করছে সাইবার নিরাপত্তাতেও।
পিস্তোরিয়াসের মতে, “প্রতিদিনই রাশিয়া চালাচ্ছে হাইব্রিড যুদ্ধ—ভুয়া খবর, সাইবার আক্রমণ, বিভ্রান্তি ছড়ানো, সমুদ্রতলের অবকাঠামোতে হুমকি সৃষ্টি। এখনই সময় আরও সতর্ক হওয়ার।”
এ যেন এক ঠান্ডা যুদ্ধের পুনর্জন্ম—শীতল উত্তর আটলান্টিকের ঢেউয়ের নিচে চলছে অদৃশ্য লড়াই, যেখানে শব্দ, প্রযুক্তি আর সাহস মিশে যাচ্ছে নীরব কিন্তু তীক্ষ্ণ প্রতিযোগিতায়।
















