বুয়েনোস আইরেসের রাস্তায় আজ ধোঁয়াটে হাওয়া। নীল-সাদা পতাকার ঢেউয়ের নিচে হাজারো কণ্ঠে একটিই প্রশ্ন—এই নির্বাচনে আর্জেন্টিনার ভাগ্য কোন পথে মোড় নেবে? প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মাইলির সামনে যে রাজনৈতিক লড়াই, তা আর কেবল একটি ভোটযুদ্ধ নয়—এটি তার নীতির, তার বিশ্বাসের, তার ভবিষ্যতের পরীক্ষাও বটে।
আগামী ২৬ অক্টোবর দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ভোটে নির্ধারিত হবে প্রতিনিধি পরিষদের অর্ধেক সদস্য এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ। বর্তমানে সংসদের দুই কক্ষই নিয়ন্ত্রণ করছে মাইলির ডানপন্থী দল ‘লা লিবারতাদ আভানজা’র বিরোধী বাম ও মধ্যপন্থী জোট। এই নির্বাচন মাইলির জন্য তাই এক সুযোগ—ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার।
বিশ্লেষক আন্দ্রেস মালামুদ বলেন, সরকার চাইছে সংসদের এক-তৃতীয়াংশ আসন অর্জন করতে, যাতে একটি ‘বিধানিক ঢাল’ তৈরি হয়। এতে মাইলির ভেটো ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং ভবিষ্যতে অভিশংসনের ঝুঁকি থেকে তিনি সুরক্ষা পাবেন।
তবে এ লড়াই সহজ নয়। নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যবৃদ্ধি ও একের পর এক কেলেঙ্কারি তার জনপ্রিয়তাকে টলিয়ে দিচ্ছে। মাইলির প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখনো দৃশ্যমান নয়।
গত বছর নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই তিনি সরকারি খরচে ছুরি চালিয়েছেন—স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সেবাখাতে বাজেট কাটছাঁট করে বাজেট উদ্বৃত্ত অর্জনের চেষ্টা করেছেন। মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমলেও মুদ্রার মান বাড়ায় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ভীষণভাবে কমে গেছে। শহরের মানুষ এখনো আগের মতোই সংগ্রাম করছে, অথচ ভবিষ্যতের যে উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা এখনো দূর আকাশের মেঘের মতো অনিশ্চিত।
মাইলির রাজনৈতিক যাত্রা বরাবরই ভিন্নধর্মী। নিজেকে তিনি বলেন ‘অ্যানার্কো-ক্যাপিটালিস্ট’। রাজনীতিকে তিনি একসময় “চোরদের আস্তানা” বলেছিলেন, কিন্তু আজ তিনি নিজেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে এলন মাস্ক—অনেকে প্রকাশ্যে তার সমর্থক।
তবে তার প্রশাসনকে এখন গ্রাস করছে কেলেঙ্কারির ছায়া। অক্টোবরের শুরুতে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও প্রার্থী হোসে লুইস এসপার্টের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ, এক মাদক ও জালিয়াতি মামলায় অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিনি অর্থ গ্রহণ করেছিলেন। মাইলি একে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করলেও, জনমনে তার প্রভাব পড়েছে প্রবলভাবে।
আরেক কেলেঙ্কারিতে নাম এসেছে তার বোন কারিনা মাইলির। অভিযোগ, তিনি ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ দাবি করেছিলেন। মাইলি এটিকেও রাজনৈতিক অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু সংসদে তার বিরোধীরা এখন আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী। তারা একাধিকবার মাইলির ভেটো অগ্রাহ্য করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ ফিরিয়ে আনে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও মাইলি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ভরসা খুঁজেছেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি ২০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় চুক্তি পান। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, এটি মাইলির নির্বাচনী শক্তি বাড়াতেই করা হয়েছে—তবে সতর্ক করে দেন, ব্যর্থ হলে সহায়তাও হারাতে হবে। এই ঘোষণার পর আর্জেন্টাইন মুদ্রার মান আরও নিচে নেমে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্যারোলিনা ব্যারি বলেন, “সরকার এখন এক অনিশ্চিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। সংসদে পরাজয়, কেলেঙ্কারি আর অর্থনৈতিক স্থবিরতা মাইলির অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে।”
জরিপে দেখা গেছে, কেন্দ্র-বামপন্থী দল ফুয়ের্সা পাত্রিয়া বর্তমানে লা লিবারতাদ আভানজার চেয়ে অন্তত ১৫ পয়েন্টে এগিয়ে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে একটিমাত্র বিষয়ে—অর্থনীতি।
গবেষক মারিয়ানা হেরেদিয়া বলেন, “গত বছর মাইলি কিছুটা স্থিতি এনেছিলেন, কিন্তু এখন তার মিতব্যয়ী নীতির কষ্ট জনগণ সরাসরি অনুভব করছে। অর্থনীতি স্থবির, এবং শুধুমাত্র খনন ও তেল খাতেই সামান্য গতি দেখা যাচ্ছে—যা শহুরে জনগণের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলছে না।”
মালামুদও একই কথা বলেন, “তার সমর্থন টিকে আছে ভবিষ্যতের আশা থেকে। কিন্তু যখন মানুষ সেই ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না, তখন আশা ভেঙে যায়।”
আর্জেন্টিনার এই নির্বাচনে তাই কেবল সংসদের আসন নির্ধারণ নয়—এটি এক জাতির ধৈর্য, এক নেতার বিশ্বাস এবং জনগণের আশার পরীক্ষা। ডলারের দোলাচলে, দামের আগুনে, এবং দুর্নীতির ছায়ায় ঢাকা এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা এখন তাকিয়ে আছে এক অনিশ্চিত আগামী দিনের দিকে।
















