আর্জেন্টিনার জাদুকর লিওনেল মেসির জোড়া গোলেই উজ্জ্বল হলো ইন্টার মায়ামি। ন্যাশভিল এসসির বিপক্ষে মেজর লিগ সকার (এমএলএস) কাপের প্রথম রাউন্ডের প্লে-অফে ৩-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিল তারা। যেন মেসির পায়ের ছোঁয়ায় আবারও ফুটে উঠল স্বপ্ন, আলো আর আশার রঙ।
শুক্রবার রাতে ফ্লোরিডার উষ্ণ আবহে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে মেসির পাশাপাশি গোল করেছেন তরুণ তারকা তাদেও আয়েন্দে। তিন ম্যাচের এই সিরিজের প্রথম লেগ জিতে এগিয়ে গেল ইন্টার মায়ামি। দ্বিতীয় ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ১ নভেম্বর, ন্যাশভিলের মাঠে।
ম্যাচ শুরুর আগেই মেসিকে সম্মান জানানো হয় সোনালি বুট পুরস্কারে, কারণ নিয়মিত মৌসুমে ২৮ ম্যাচে ২৯ গোল করে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। পুরস্কার হাতে নিয়েই যেন আরও একবার প্রমাণ করলেন কেন তিনি ফুটবলের সম্রাট।
মাত্র ১৯তম মিনিটেই গোল করে ইন্টার মায়ামিকে এগিয়ে দেন মেসি। সতীর্থ লুইস সুয়ারেজের পাস থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে করা হেডে তিনি বল জালে জড়িয়ে দেন। সেই মুহূর্তে গ্যালারিতে উঠে আসে একসুরে চিৎকার—“মেসি! মেসি!”
সার্জিও বুসকেটস ডান প্রান্তে বল পেয়ে পাস দেন রদ্রিগো দে পলকে, যিনি বল বাড়িয়ে দেন মেসির দিকে। মেসি পাস দেন সুয়ারেজকে, আর ফিরে আসা বলে নিজেই করেন জাদুকরী ফিনিশ।
৬২ মিনিটে আয়ান ফ্রের ক্রস থেকে হেডে গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন তাদেও আয়েন্দে। তখন মনে হচ্ছিল ম্যাচের গতি নির্ধারিত হয়ে গেছে।
দে পল বলেন, “আমরা জানতাম প্লে-অফের লড়াই কঠিন হবে। তাই আমরা ঘরের মাঠেই জয় দিয়ে শুরু করতে চেয়েছিলাম। আজ দলের প্রত্যেকে দুর্দান্ত খেলেছে, কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন রক্ষণে নামতে হবে—সব ঠিক বুঝেছে। আমাদের দল বেড়ে উঠছে, এটিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
ম্যাচের শেষদিকে, যোগ করা সময়ের নবম মিনিটে আবারও গোল করেন মেসি। জর্দি আলবার বাম দিক থেকে পাঠানো বল থামাতে ব্যর্থ হন ন্যাশভিল গোলরক্ষক জো উইলিস, আর সেই সুযোগে সহজেই বল জালে পাঠান মেসি।
ন্যাশভিলের হানি মুকতার যদিও ইনজুরি টাইমের শেষ মুহূর্তে একটি সান্ত্বনার গোল করেন, কিন্তু তা শুধু স্কোরলাইনে রঙ যোগ করল, ফলাফল বদলাতে পারেনি।
এই জয় আসে ঠিক একদিন পর, যখন মেসি ইন্টার মায়ামির সঙ্গে নতুন তিন বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা তাকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ক্লাবটিতে ধরে রাখবে। এ যেন মায়ামির জন্য উৎসবের পর উৎসব—জয় আর মেসির প্রতিশ্রুতির আনন্দে মিশে গেল এক অপূর্ব সুর।
এমএলএস কমিশনার ডন গারবার নিজে উপস্থিত ছিলেন মেসির সোনালি বুট প্রদান করতে। তিনি বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি লিও এই ক্লাব, এই শহর আর এই লিগে এমনভাবে জাদু ছড়িয়ে দেবে। তিনি এমএলএসের গতিপথই বদলে দিয়েছেন। আগামী তিন বছর তাকে দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য এক বিশাল উপহার।”
দে পলও মেসির প্রশংসায় ভাসিয়ে বলেন, “প্রতিটি সপ্তাহে আমরা মেসিকে দেখি, এটা এক বিশাল সুবিধা। তাকে উপভোগ করতে হবে, কারণ এমন খেলোয়াড় বারবার জন্মায় না। আমি তার নতুন চুক্তিতে ভীষণ খুশি, কারণ আমরা আরও কিছু বছর একসঙ্গে খেলতে পারব।”
দলের কোচ হাভিয়ের মাসচেরানো, যিনি নিজেও একসময় মেসির সতীর্থ ছিলেন, সতর্ক করে বলেন, “আমরা জয় পেয়েছি, কিন্তু কাজ এখানেই শেষ নয়। ন্যাশভিল এমন একটি দল, যারা মুহূর্তে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আগের ম্যাচের তুলনায় আমরা অনেক কিছু বদলেছি, কিন্তু আরও উন্নতি দরকার।”
মেসির পারফরম্যান্সে যেমন মাঠ আলোকিত, তেমনি তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে গ্যালারির প্রতিটি কোণে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার চোখে ছিল একটাই দৃশ্য, মেসির হাসি আর তার পায়ের ছোঁয়ায় তৈরি হওয়া সোনালি মুহূর্ত।
ইন্টার মায়ামির সমর্থকদের জন্য এটি শুধু একটি জয় নয়, এটি এক আবেগময় যাত্রা। তাদের প্রিয় মেসি আবারও দেখিয়ে দিলেন, বয়স শুধু সংখ্যা, প্রতিভা চিরন্তন। প্রতিটি গোল যেন ছিল কবিতার মতো, প্রতিটি পাস একেকটি চিত্রকর্ম।
এই জয় শুধু এমএলএস কাপের পথে এগিয়ে যাওয়ার নয়, এটি মায়ামির স্বপ্নকেও নতুনভাবে জ্বালিয়ে তোলার প্রতীক। আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছেন এক মানুষ, যার নাম লিওনেল মেসি—যিনি মাঠে নামলেই ফুটবলের ইতিহাস নতুন করে লেখা হয়।
















