নেদারল্যান্ডস একটি দেশ, যেখানে টিউলিপ ফুল আর সাইকেলের রাজত্ব। কিন্তু আজ সেই রঙিন দেশটি ভর করেছে উদ্বেগ, বিভাজন আর অভিবাসন ভীতির কুয়াশায়। আগামী ২৯ অক্টোবর সেখানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আকস্মিক সংসদীয় নির্বাচন, যা দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এবং এই নির্বাচনের মূল আলোচ্য বিষয় অভিবাসন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ধারণা করা হচ্ছে, ডানপন্থী পার্টি ফর ফ্রিডম আবারও সর্বাধিক আসন পেতে পারে। এই দলের নেতৃত্বে আছেন বিতর্কিত রাজনীতিক গিয়ার্ট উইল্ডার্স, যিনি অভিবাসন-বিরোধী মতাদর্শের জন্য সুপরিচিত।
তবে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নেদারল্যান্ডসের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। দেশটির আনুপাতিক ভোটব্যবস্থায় কোনও দলই কখনোই এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। তাই PVV-র জন্যও জোট রাজনীতির দ্বার অনিবার্য।
জোটভাঙা থেকে আগাম নির্বাচন
২০২৩ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে PVV সর্বাধিক ভোট পেয়েছিল এবং তিনটি ডানপন্থী দল—বিবিবি (Farmer-Citizen Movement), এনএসসি (New Social Contract) এবং ভিডিভি (People’s Party for Freedom and Democracy)—এর সঙ্গে জোট সরকার গঠন করেছিল।
কিন্তু মাত্র কয়েক মাস পর, অভিবাসন নীতিকে ঘিরে এই জোট ভেঙে পড়ে। PVV চেয়েছিল আরও কঠোর আশ্রয়নীতি—নতুন আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা ও অপরাধে জড়িত দ্বৈত নাগরিকদের বহিষ্কার। কিন্তু অন্যান্য দল এই প্রস্তাবে একমত হয়নি।
উইল্ডার্স এক নাটকীয় টুইটে ঘোষণা করেন যে তার দল জোট থেকে সরে দাঁড়াবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী ডিক স্কোফ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং অক্টোবরের জন্য আগাম নির্বাচনের ডাক দেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে আগস্টে, যখন এনএসসি দলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাসপার ফেল্ডক্যাম্প গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আনতে ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করেন। এর পর NSC-র অন্যান্য সদস্যরাও সরকার থেকে বেরিয়ে আসেন।
নতুন ভোটযুদ্ধের পূর্বাভাস
ডাচ সংবাদমাধ্যম এর ১৪ অক্টোবরের জরিপে দেখা গেছে, PVV এবারও ৩১টি আসন পেতে পারে। কেন্দ্র-বামপন্থী জোট গ্রিনলিংক্স-পিভিডিএ পেতে পারে ২৫টি আসন, আর খ্রিষ্টান ডেমোক্র্যাটিক অ্যাপিল ২৩টি।
তবে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৭৬টি আসন, যা কোনো দলই এখনো অর্জন করতে পারেনি। তাই নতুন জোট সরকার গঠন প্রায় নিশ্চিত।
অভিবাসন ইস্যুতে উত্তপ্ত রাজনীতি
নেদারল্যান্ডসের জনমনে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় অভিবাসন। আরেকটি জরিপে ২৭,০০০-এর বেশি ভোটার অংশ নিয়েছেন, যেখানে অর্ধেক ভোটার বলেছেন, তারা এ বছর ভোট দেবেন অভিবাসন নীতির ওপর নির্ভর করে।
PVV দৃঢ়ভাবে অভিবাসন-বিরোধী অবস্থানে আছে। তারা চায় সীমান্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হোক এবং আশ্রয় আইন আরও কঠিন করা হোক। বিপরীতে, বছরে ৪০,০০০ থেকে ৬০,০০০ অভিবাসী গ্রহণের পক্ষে।
অক্টোবরের মাঝামাঝি আমস্টারডামের মিউজিয়ামপ্লেইন-এ অনুষ্ঠিত এক ডানপন্থী সমাবেশে হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। তারা ‘অভিবাসন বন্ধ করো, নিরাপদ নেদারল্যান্ডস চাই’—এই স্লোগানে মুখর ছিল। পুলিশ জানায়, কিছু উগ্র বিক্ষোভকারী পাথর ছোঁড়ে, গাড়িতে আগুন দেয় এবং একটি রাজনৈতিক অফিসের জানালা ভেঙে ফেলে।
সমাজে বাড়ছে বিভাজন
ইউরোপের গড় হিসেবে নেদারল্যান্ডসের অভিবাসীর হার ১৬ শতাংশ, যা ইইউর অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ২.৯ মিলিয়ন অভিবাসী বসবাস করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংখ্যা ডানপন্থী রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। এরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী মার্ক ভ্যান অস্টাইয়েন বলেন, “অভিবাসন এখন প্রতিটি নীতির সঙ্গে যুক্ত—বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই এটি আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।”
দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৪.৩৪ লাখ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে, যার মধ্যে ৩.৫ লাখই অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য প্রয়োজন। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অভিবাসীদের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে।
২০২৪ সালে দেশে ৩.১৬ লাখ নতুন অভিবাসী এসেছে—যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় ১৯,০০০ কম। তবুও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে এখনো অভিবাসনকেই দায়ী করা হচ্ছে।
ডানপন্থী উত্থান ও বর্ণবিদ্বেষের ছায়া
PVV-র উত্থানের পর সমাজে বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক অভিবাসী জানিয়েছেন, মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি খোলামেলাভাবে বর্ণবাদী মন্তব্য করছে—অনলাইনে এবং বাস্তবে উভয় জায়গাতেই।
বিআইজে১ নামের এক বামপন্থী দল এই প্রবণতার বিরোধিতা করছে। দলের প্রার্থী নুরা ওউল ফাকির বলেন, “আমরা অভিবাসনকে আলাদা করে দেখি না। বৈষম্যের প্রতিটি রূপ পরস্পর সম্পর্কিত, এবং সমতা প্রতিষ্ঠা মানে কেবল অভিবাসনের প্রশ্ন নয়, এটি সমাজব্যবস্থার সব স্তরে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।”
তবে জরিপে দেখা গেছে, বামপন্থী এই দলটি কোনও আসনই পেতে পারছে না।
ভুয়া খবরের প্রভাব
নেদারল্যান্ডসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ছড়িয়ে পড়ছে ভুয়া খবর ও এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। সমর্থকদের একটি ফেসবুক পেজে অভিবাসনবিরোধী এআই-চিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে শ্বেতাঙ্গ পরিবারকে ‘বিদেশিদের দ্বারা হুমকির মুখে’ দেখানো হয়েছে।
সরকার এই ভুয়া তথ্য রোধে নতুন নীতিমালা আনার চেষ্টা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের আনুপাতিক ভোটব্যবস্থা ডানপন্থী চরমপন্থার বিস্তার কিছুটা রোধ করতে পারে।
উইল্ডার্সের বিতর্কিত অতীত
নেতা গিয়ার্ট উইল্ডার্স দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রে। তিনি ইসলামকে “নাৎসিবাদের সমান” বলেছিলেন ২০০৭ সালে এবং কোরআনকে “ফ্যাসিবাদী বই” হিসেবে অভিহিত করেন। এই মন্তব্যের কারণে তার বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণের মামলা হলেও, আদালত পরে তাকে খালাস দেন।
সম্প্রতি, তিনি এক প্রচারণায় দুটি নারীর ছবি প্রকাশ করেন—একজন স্বর্ণকেশী, হাস্যোজ্জ্বল, অন্যজন হিজাব পরা এবং ক্লান্ত মুখের। ছবির নিচে লেখা ছিল, “পছন্দ আপনার—২৯ অক্টোবর সিদ্ধান্ত নিন।” এই পোস্টে ব্যাপক সমালোচনা হলেও, ডানপন্থী ভোটারদের মধ্যে তা জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ভোটের অনিশ্চয়তা
যদিও জরিপে এগিয়ে আছে, তবে প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। কেন্দ্র-বামপন্থী যদি ডানপন্থী বিতর্ক থেকে নিজেদের দূরে রেখে নিজেদের নীতিতে জোর দিতে পারে, তবে শেষ মুহূর্তে চমক দেখা যেতে পারে।
বিশ্লেষক নাসরেদ্দিন তাইবি বলেন, “ডানপন্থী আন্দোলন কেবল রাজনীতি নয়, মানুষের মানসিক বিভাজন তৈরি করছে। মধ্যপন্থী দলগুলোও এখন ডানপন্থীদের ভাষায় কথা বলছে, যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য বিপজ্জনক।”
নেদারল্যান্ডসের এই নির্বাচন শুধু এক দেশের সরকার নির্ধারণ নয়—এটি এক জাতির চেতনা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। অভিবাসনকে ঘিরে ভয়, সন্দেহ ও রাজনীতির খেলায় যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা শুধু ভোটের বাক্সে নয়, সমাজের প্রতিটি হৃদয়ে ছাপ ফেলেছে।
কেউ চায় কঠোর সীমান্ত, কেউ চায় মানবতার হাত প্রসারিত থাকুক—এই দ্বন্দ্বেই আজ ইউরোপের এক শান্ত দেশের রঙিন টিউলিপক্ষেত যেন মেঘে ঢাকা পড়ছে।
















