দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশে আবারও ঝড় বইছে—কিন্তু এবার তা প্রকৃতির নয়, বরং অর্থনীতির। যে অঞ্চলের দেশগুলো একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের সুযোগে উত্থানের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্ন আজ ভেঙে পড়ছে নিজেরাই তৈরি করা বাণিজ্যিক ঘূর্ণিতে।
২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন, তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ছিল সবচেয়ে বড় বিজয়ী। চীনে নতুন শুল্ক আরোপ এড়াতে অসংখ্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন লাইন সরিয়ে নেয় ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা কম্বোডিয়ার মতো দেশে। এই পরিবর্তনের ফলেই জন্ম নেয় নতুন শব্দ—“চায়না প্লাস ওয়ান”। চীনের বিকল্প হিসেবে এক বা একাধিক এশীয় দেশে কারখানা স্থাপনই ছিল এই ধারণার মূল।
তবে সময় বদলে গেছে। ২০২৫ সালের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফা শাসনে আবারও শুরু হয়েছে শুল্কের ঝড়। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আমদানি শুল্ক বসিয়েছে, আর চীন তার পণ্য ঠেলে দিচ্ছে এ অঞ্চলে। ফলে দুই পরাশক্তির টানাপোড়েনে আজ চরম চাপের মুখে পড়েছে এই অঞ্চল।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জয়ন্ত মেনন বলেন, “দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন এক সূক্ষ্ম দড়ির ওপর হাঁটছে। চীন বা যুক্তরাষ্ট্র—কারও পক্ষে পুরোপুরি দাঁড়ানো সম্ভব নয়। দুজনই তাদের জন্য অপরিহার্য।”
চীন হলো আসিয়ানভুক্ত ১১ দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, আর যুক্তরাষ্ট্র যদিও চতুর্থ, তবুও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ঘোষণা করেন “লিবারেশন ডে ট্যারিফ”—যার আওতায় কম্বোডিয়ায় ৪৯ শতাংশ, লাওসে ৪৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৪৬ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়। এমনকি থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইন, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মিত্র, তারাও ছাড় পায়নি—তাদের ওপর আরোপ হয় যথাক্রমে ৩৬ ও ১৭ শতাংশ শুল্ক।
পরে আলোচনা ও রাজনৈতিক দর কষাকষির মাধ্যমে কিছুটা শিথিলতা এলেও মিয়ানমার ও লাওসে এখনও ৪০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর। বিশেষ করে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং গাড়ির যন্ত্রাংশের মতো শিল্পে এই চাপ মারাত্মক।
ওয়াশিংটন এরপর আরেক ধাপ এগিয়ে জুলাইয়ে ঘোষণা করে ৪০ শতাংশ “ট্রান্সশিপমেন্ট ট্যারিফ”—যে সব পণ্য মূলত চীনের তৈরি কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে, সেগুলোর ওপর এই নতুন কর আরোপ করা হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক নিক ম্যারো মনে করেন, এই পদক্ষেপ সরাসরি “চায়না প্লাস ওয়ান” মডেলকে আঘাত করেছে। তাঁর ভাষায়, “এটা এক ধরনের হুঁশিয়ারি, বিশেষ করে উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—চীনের বিকল্প হলেও, নিয়মের বাইরে কেউ যাবে না।”
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৭ শতাংশ থেকে নামিয়ে ৪.৩ শতাংশ করেছে। তাদের মতে, নতুন বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো ও শুল্কনীতির প্রভাবে অঞ্চলটির রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি ধাক্কা খাচ্ছে।
তবে এর বিপরীতে চীনের রপ্তানি বেড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে। চীনের কাস্টমস তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে আসিয়ান অঞ্চলে তাদের রপ্তানি ১২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮৬ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে তা আরও ১৪.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৮৭.৫ বিলিয়নে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তা দ্রুত বাড়ছে।
চীনের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাজার খুঁজছে—যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় গন্তব্য।
জয়ন্ত মেনন বিশ্লেষণ করে বলেন, “চীনের রপ্তানি যেমন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাড়ছে, ঠিক তেমনি আসিয়ান দেশগুলোর রপ্তানিও বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। অর্থাৎ পণ্যগুলো একভাবে স্থানান্তরিত হচ্ছে—চীন থেকে এই অঞ্চলে, সেখান থেকে আমেরিকায়।”
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আসিয়ান দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে ৩৫২.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য ও সেবা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, নিউইয়র্কভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিএলজি পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ চীনা রপ্তানিকারক এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাজার খুঁজছে। ৭১ শতাংশ ব্যবসায়ী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে নতুন গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে তারা এখন “অবিশ্বাস্য ও অনিশ্চিত” বাণিজ্য সহযোগী হিসেবে দেখছে।
তবে চীনের অতিরিক্ত রপ্তানির ঢল এ অঞ্চলের স্থানীয় শিল্পগুলোতে অস্বস্তি তৈরি করেছে। ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে টেক্সটাইল—সবখানেই প্রতিযোগিতা বেড়েছে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের শিল্পপতিরা অভিযোগ করছেন, চীনা কোম্পানিগুলো দাম কমিয়ে বাজার দখল করছে।
অর্থনীতিবিদ ক্রিস বেডর বলেন, “ডাম্পিং প্রমাণ করা যেমন কঠিন, তেমনি রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুলও। তাই আসিয়ান দেশগুলো সরাসরি চীনকে দোষারোপ করতে চায় না, কারণ তারা এই সরবরাহ চেইনেরই অংশ।”
ঠিক যেমন তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও করছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা না করে একেক দেশ আলাদাভাবে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে আলোচনা করছে, যেন নিজ নিজ স্বার্থটুকু রক্ষা করা যায়।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিশ্লেষক ইয়ান চং বলেন, “আসিয়ান বরাবরই ‘কাউকে না বেছে চলা’ নীতিতে বিশ্বাস করে এসেছে। কিন্তু এই নিরপেক্ষতা এখন তাদেরই গলায় ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “তারা ভেবেছিল ওয়াশিংটন ও বেইজিং দুজনকেই খুশি রাখতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তারা এখন দুই দিক থেকেই চাপে।”
এখনও পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি। বরং দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। জয়ন্ত মেনন আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প থামবেন না। তাঁর ভাষায়, “আমার ভয়, এটা শেষ নয়—বরং শুরু। ট্রাম্প শুল্ক ভালোবাসেন, আর তিনি মনে করেন এতে আমেরিকার ঘাটতি কমবে। তাই থামার কোনো কারণ নেই।”
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত পথে। বিনিয়োগ আসছে, কিন্তু তার স্থায়িত্ব নেই। রপ্তানি বাড়ছে, কিন্তু মুনাফা কমছে। শিল্প গড়ে উঠছে, কিন্তু নীতি অনিশ্চয়তায় তা টেকসই হচ্ছে না।
এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন যেন এক অদৃশ্য ঘূর্ণির মাঝে—চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন আর যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল শুল্কনীতির মধ্যে দোল খাচ্ছে। একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে ঝুঁকি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একসময় ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন আশার নাম। কিন্তু আজ সেটিই পরিণত হয়েছে শুল্ক ও প্রতিযোগিতার যুদ্ধক্ষেত্রে। যে নরম বাতাসে তারা উড়েছিল, সেই বাতাস এখন ঝড়ে পরিণত হয়েছে। তবু এ অঞ্চলের প্রাণশক্তি এখনো অবশিষ্ট—তারা ইতিহাসের মতোই শিখছে টিকে থাকতে, ভারসাম্য রাখতে, এবং ঝড় থেমে গেলে আবারও উড়তে।
















