ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক এখন অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতার বিস্তৃত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দশকে পারস্পরিক সহযোগিতা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়েছে।
ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কের ঐতিহাসিক শিকড় বহু পুরোনো। প্রাচীন কোরীয় ইতিহাসে অযোধ্যার রাজকন্যা সুরিরত্নের কোরিয়ায় যাত্রা এবং গয়া রাজ্যের রাজা কিম সুরোর সঙ্গে তাঁর বিবাহের কাহিনি দুই দেশের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। পরবর্তীতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোরিয়াকে নিয়ে লেখা কবিতাও দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়।
দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় এক হাজার নয়শ তিয়াত্তর সালে। এরপর রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়তে থাকে। দুই হাজার দশ সালে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হয়।
দুই হাজার পঁচিশ সালে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ৫৬ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি ছিল প্রায় ৬৪০ কোটি ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি ছিল প্রায় এক হাজার ৯২০ কোটি ডলার। বাণিজ্য আরও বাড়িয়ে দশকের শেষ নাগাদ পাঁচ হাজার কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভারতের তৈরি কে নাইন বজ্র কামান দুই দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ও দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারতে আরও একশ কামান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন কৌশলগত পরিকল্পনায় অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি, উৎপাদন, গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরবরাহব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার পাশাপাশি ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করাও দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থের অংশ হয়ে উঠেছে।
সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংস্কৃতি, গান, নাটক, সৌন্দর্যচর্চা ও খাবারের প্রতি ভারতে আগ্রহ বাড়ছে। একইভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্র, শাস্ত্রীয় শিল্প, যোগব্যায়াম ও খাবারের প্রতিও দক্ষিণ কোরিয়ায় আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
দুই দেশ সংস্কৃতি বিনিময় কর্মসূচিও আরও কয়েক বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলচ্চিত্র, অ্যানিমেশন ও দৃশ্যভিত্তিক সৃজনশীল শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুই হাজার আটাশ-উনত্রিশ সময়কে ভারত-দক্ষিণ কোরিয়া বন্ধুত্বের বছর হিসেবে পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক সহযোগিতা ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা দুই দেশের অংশীদারত্বের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। শিক্ষা, বৃত্তি, ভাষা শিক্ষা ও একাডেমিক বিনিময়ের মাধ্যমেও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক এখন শুধু ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব বা কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নত প্রযুক্তি, উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে ভারতের বড় বাজার, শিল্পভিত্তি, দক্ষ জনশক্তি ও কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগানো গেলে এই অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও ঘোষণাগুলো বাস্তব শিল্প, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতায় কতটা রূপ নেয়, সেটিই ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রধান পরীক্ষার বিষয় হবে। পারস্পরিক সক্ষমতাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে পারলে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হতে পারে।
















