হলুদ-বাসন্তী রঙে সেজেছে চারুকলা, ঋতুরাজকে বরণে মুখর রাজধানী। ছবি: সংগৃহীত
‘ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক, আজ বসন্ত’—কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই অমোঘ পঙক্তিকে সত্য প্রমাণ করে প্রকৃতিতে আজ ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী গান। আজ পহেলা ফাল্গুন। একইসাথে দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ভালোবাসা দিবস বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ হিসেবে। দ্বিগুণ উৎসবে মেতেছে তেরো নদীর এই বাংলা।
উৎসবের সূচনা ও ইতিহাস
বাংলাদেশে বসন্ত উৎসবের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন খুব বেশি পুরনো নয়। ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রথমবার বড় পরিসরে বসন্ত বরণ উৎসবের আয়োজন করে। সেই থেকে প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্ণিল উৎসবে সেজে ওঠে ঢাকা।
ফাল্গুন মাসের নামকরণ নিয়েও রয়েছে কৌতূহল। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, ‘ফাল্গুনী’ নক্ষত্রের নাম থেকে এই মাসের উৎপত্তি। ১৯৫০-৬০ এর দশকে যখন পাকিস্তানের শাসন-শোষণ চরমে, তখন বাঙালি সংস্কৃতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে রবীন্দ্রসংগীত ও পহেলা ফাল্গুন পালন ছিল এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ।
প্রকৃতিতে নতুন প্রাণের স্পন্দন
শীতের রুক্ষতা ঝেড়ে ফেলে প্রকৃতি এখন সেজেছে নতুনের আবহে।
- গাছে নতুন পাতা: শিমুল, পলাশ আর কৃষ্ণচূড়ার লাল আভা চারদিকে।
- পাখির গান: কোকিলের কুউ কুউ ডাক জানান দিচ্ছে শীত বিদায় নিয়েছে।
- ফুলের ঘ্রাণ: আম্রমঞ্জরি আর বিচিত্র বুনো ফুলের গন্ধে বাতাস এখন মাতোয়ারা।
দ্রোহ ও রাজনীতির ফাগুন
বাঙালির কাছে ফাল্গুন মানে শুধু প্রেম বা উৎসব নয়, এটি দ্রোহের মাসও বটে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলা ৮ই ফাল্গুন। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় রফিক, শফিক, বরকত, সালামরা রাজপথে রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। শিমুল-পলাশের লাল রঙ আজও বাঙালির মনে সেই রক্তস্নাত ইতিহাসের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। তাই ফাল্গুন যেমন মিলনের মাস, তেমনি এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার চেতনা শাণিত করার মাস।
বিশেষ উদ্ধৃতি: বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ভাষায়—
“বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে…”
উৎসবের সাজগোজ
আজকের এই দিনে ঢাকাসহ সারাদেশের রাজপথ ছেয়ে গেছে হলুদ, বাসন্তী আর লাল রঙের শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে। নারীদের মাথায় ফুলের টায়রা আর বসন্তের গান—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ। চারুকলার বকুলতলা থেকে শুরু করে রবীন্দ্র সরোবর—সবখানেই এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
















