যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ নিয়ে তোলপাড়; জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব হারানোর শঙ্কা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আগ্রাসী প্রয়োগে বৈশ্বিক বাণিজ্য যখন টালমাটাল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত সাম্প্রতিক ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (Reciprocal Trade Agreement) নিয়ে দেশে ও বিদেশে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এই নামমাত্র ১ শতাংশ শুল্ক হ্রাসের বিনিময়ে বাংলাদেশকে যেসব শর্ত মানতে হয়েছে, তাকে অনেক বিশ্লেষক ‘আক্ষরিক অর্থেই দাসত্বের চুক্তি’ বলে অভিহিত করছেন। চুক্তির আওতায় প্রায় ৪,৪০০ আমেরিকান পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া ছাড়াও ১৫ বিলিয়ন ডলারের গ্যাস, বোয়িং বিমান এবং বিপুল পরিমাণ কৃষি পণ্য কিনতে বাধ্য থাকবে ঢাকা। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ তার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে মার্কিন নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যাবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত বছরের আগস্টে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এক গোপন ‘এনডিএ’ (NDA) চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক হার ৩৭ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারির নতুন চুক্তিতে যেসব কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তা দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন থেকে আমেরিকার অনুমতি ছাড়া রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি কিংবা জ্বালানি কিনতে পারবে না।
এমনকি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এছাড়াও মার্কিন শ্রম আইন কার্যকর করা, বন্দর ও শিপিংয়ের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আমেরিকার সাইবার-নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে আনা এবং মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন নীতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আহমেদ সাঈদের মতো কলামিস্টরা দাবি করছেন।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না বাংলাদেশ; বরং আমেরিকার মানদণ্ডই হবে চূড়ান্ত। এছাড়া রিকন্ডিশন গাড়ি ও যন্ত্রপাতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার শর্তটি দেশীয় শিল্পের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭২ সালের ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি’কে যারা পঁচিশ বছরের গোলামি চুক্তি বলে সমালোচনা করেছিলেন, তাদের কাছে এই চুক্তিটি আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, মৈত্রী চুক্তিতে কোনো বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বর্তমান চুক্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সরাসরি ওয়াশিংটনের মুখাপেক্ষী করে তোলা হয়েছে।
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে দেশকে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংকটে ফেলতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
















