অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা, যা একসময় বায়োটেরোরিজমের মতো আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল, তা প্রায় দুই মাস ধরে আবার আলোচনায় এসেছে। যদিও ২০১০ সালে সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের সময় সরকার দেশজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করেছিল, বর্তমানে এটি রংপুর, গাইবান্ধা ও মেহেরপুরে অসুস্থ গবাদিপশুর মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে ডায়রিয়া, অপুষ্টি ও যক্ষার মতো রোগে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর তুলনায় বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্সকে মোটেই আতঙ্কজনক মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।
অ্যানথ্রাক্স কী এবং এর প্রকৃতি
অ্যানথ্রাক্স হলো Bacillus anthracis ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট পশুর একটি তীব্র ও মারাত্মক রোগ, যা ১৮৭৭ সালে রবার্ট কচ আবিষ্কার করেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এই রোগের অস্তিত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৪৯ সালে প্রথমবার এটি রিপোর্ট করা হয়।
মহামারীর সম্ভাবনা নেই: করোনার মতো অ্যানথ্রাক্সের মহামারী হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কারণ এর ৮৯টি স্ট্রেইনের মধ্যে অ্যান্টিজেনিক্যালি কোনো পার্থক্য নেই। শুধু ভিরুলেন্ট (রোগ সৃষ্টিকারী) স্ট্রেইনগুলোই রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। নন-ভিরুলেন্ট স্ট্রেইন ব্যবহার করে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয় (যেমন স্টার্ন স্ট্রেইন)। তবে ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে যদি এর মিউটেশন ঘটে তবে তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই নিয়মিত গবেষণা চালু রাখা প্রয়োজন।
জীবাণুর বৈশিষ্ট্য ও রোগ বিস্তার
এই জীবাণুর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে এটি স্পোর (Spore) তৈরি করে। এই স্পোর পরিবেশে অত্যন্ত প্রতিরোধী; যা লবণযুক্ত চামড়া, সাধারণ তাপমাত্রা ও জীবাণুনাশকেও টিকে থাকতে পারে এবং মাটিতে ৬০-১০০ বছর পর্যন্ত কার্যক্ষম থাকে।
স্পোর মাটিতে থাকার পর প্রচুর বৃষ্টিতে মাটির উপরিভাগ ধুয়ে গেলে এবং সেখানে কচি ঘাস জন্মালে গরু ঘাস খাওয়ার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। পরবর্তীতে সংক্রমিত প্রাণী অন্যান্য প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শে, শ্বাসপ্রশ্বাসে বা দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে রোগ ছড়ায়।
মানুষে সংক্রমণ: এটি একটি জুনোটিক রোগ (প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ায়)। অসুস্থ প্রাণীর সংস্পর্শে আসা, রোগাক্রান্ত গরুর মাংস কাটাকাটির সময় হাতের ক্ষতের মাধ্যমে জীবাণু মানুষের দেহে প্রবেশ করে টক্সিন উৎপাদন করে। এর ফলে সেপটিসেমিয়া তৈরি হয় এবং ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্টে মৃত্যু ঘটতে পারে।
সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যম:
রোগাক্রান্ত গরুর মাংস কাটাকাটি ও বিক্রির মাধ্যমে কসাইদের অজ্ঞতার কারণে সংক্রমণ ছড়ায়।
অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত মৃত গরু-ছাগল মাঠে বা জলাশয়ের আশেপাশে ফেলে রাখলে শিয়াল, কুকুর, শকুন ও কাকের মাধ্যমে এবং বৃষ্টির পানিতে স্পোর ছড়িয়ে পড়ে।
ইনজেশন (খাদ্য গ্রহণ), ইনহেলেশন (শ্বাসপ্রশ্বাস), উন্ড (চামড়ার ক্ষত), বাইটিং ফ্লাইস (রক্তচোষা মাছি) বা রক্তচোষা পোকামাকড়ের মাধ্যমেও এটি মানুষ ও প্রাণীতে সংক্রমিত হয়।
ক্ষারীয় মাটি ও অ্যানথ্রাক্স বেল্ট
এই জীবাণুর জন্য ক্ষারীয় (অ্যালকালাইন) মাটি অনুকূল। মাটির পিএইচ বেশি হলে সেখানে এটি বংশবৃদ্ধি বেশি করে। বাংলাদেশের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ি, রংপুর, রাজশাহীসহ পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরবর্তী বা উপকূলীয় এলাকার আশেপাশের মাটি ক্ষারীয়। বর্ষার শুরু বা শেষে এসব এলাকায় প্রথম অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ে। এইজন্য এসব এলাকাকে অ্যানথ্রাক্স বেল্ট বলা হয়।
পশুর সংখ্যার তুলনায় ভ্যাকসিন উৎপাদনের পরিমাণ সীমিত হওয়ায় প্রথমে ক্ষারীয় এলাকার পশুদের টিকা দেওয়া যেতে পারে। অ্যাভিরুলেন্ট স্পোর ভ্যাকসিন প্রয়োগের ৭-১৪ দিনের মধ্যে শরীরে প্রতিরোধ তৈরি হয়। ভ্যাকসিন দেওয়ার দুই সপ্তাহ পরেই গরু, ছাগল ও ভেড়া জবাই করে মাংস খাওয়া নিরাপদ।
রোগের লক্ষণ
প্রাণীতে: রোগটি পার-অ্যাকিউট (অতি তীব্র), অ্যাকিউট (তীব্র), সাব-অ্যাকিউট ও ক্রনিক আকারে দেখা দেয়।
- পার-অ্যাকিউট: ১-২ ঘণ্টার মধ্যে প্রাণী হঠাৎ মারা যায়। মৃত্যুর সময় নাক, মুখ ও পায়ুপথ দিয়ে জমাট না বাঁধা আলকাতরার মতো রক্ত বের হয়।
- অ্যাকিউট: ২৪–৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু ঘটে।
- ক্রনিক: প্রাণী এক সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এ সময় প্রচণ্ড জ্বর, গলার নিচে পানি জমা, ডায়রিয়া ও মলে রক্ত দেখা যায়।
মানুষে: তিনটি ফর্মে লক্ষণ প্রকাশ পায়:
- কিউটানিয়াস (ত্বক): চামড়ায় ‘ম্যালিগন্যান্ট কার্বাঙ্কল’ বা ‘বিষফোঁড়া’ দেখা দেয়।
- পালমোনারি (ফুসফুস): উল বা লেদার শিল্পের কর্মীদের মধ্যে ‘উল সর্টার’ রোগ হতে পারে। এতে ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটতে পারে।
- ডাইজেস্টিভ (অন্ত্র): অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা মাংস খেলে পেটব্যথা, ডায়রিয়া ও রক্তমিশ্রিত পাতলা পায়খানা হয়।
প্রতিরোধ ও করণীয়
অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা ও কাঠামোগত সংস্কার:
১. সচেতনতা বৃদ্ধি: টিভি, রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব গণমাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা।
২. মৃত পশু ব্যবস্থাপনা: অসুস্থ পশু জবাই ও মৃত পশুর পোস্টমর্টেম বা কাটাছেঁড়া করা যাবে না। মৃত পশুকে ২ মিটার বা ৬-৭ ফুট গভীর গর্তে চুন দিয়ে মাটি চাপা অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, গোবর, লালা, রক্তসহ সবকিছু পুঁতে ফেলতে হবে।
৩. ভ্যাকসিন ও জনবল: গবাদিপশুর সংখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন উৎপাদন, সঠিক সময়ে প্রয়োগ, এবং উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত ভেটেরিনারিয়ান ও দক্ষ মাঠকর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করা।
৪. কসাইখানা সংস্কার: প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন, জেলা ও উপজেলায় রোগমুক্ত মাংস সরবরাহের জন্য অত্যাধুনিক ‘Slaughter House’ বা কসাইখানা স্থাপন করে দক্ষ ভেটেরিনারিয়ান দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা। ‘Animal Slaughter Act’ ও ‘Quarantine Act’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
৫. আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ: পশু ও পশুজাত দ্রব্য আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করা।
৬. সুরক্ষা ও গবেষণা: যারা নিয়মিত পশুর সংস্পর্শে থাকেন (ভেটেরিনারিয়ান, কসাই) তাদের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা। মৃত গরুর মালিককে ভর্তুকি ও ইনস্যুরেন্স সুবিধা চালু করা। অ্যানথ্রাক্সসহ অন্যান্য ইমার্জিং রোগের মনিটরিংয়ের জন্য গবেষণা অব্যাহত রাখতে একটি বিশেষ গবেষণা তহবিল বরাদ্দ রাখা।
















