বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা এই খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে সদ্য ঘোষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষক ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, চুক্তিটি কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ইইউ-ভারত চুক্তির কাঠামো ও সম্ভাব্য প্রভাব
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আলোচনার পর স্বাক্ষরিত এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির আওতায় ভারতের প্রায় সব পণ্য, বিশেষ করে পোশাক, ইউরোপীয় বাজারে বিশেষ সুবিধা পাবে। ইউরোপীয় কাউন্সিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ভারতের সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে ২০২৭ সাল থেকে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, সাত বছরের মধ্যে ভারত থেকে আমদানি করা প্রায় নিরানব্বই দশমিক পাঁচ শতাংশ পণ্যের ওপর ইউরোপ ধাপে ধাপে শুল্ক প্রত্যাহার করবে। ফলে ভারতীয় পোশাকের ওপর বর্তমান প্রায় বারো শতাংশ শুল্ক পুরোপুরি উঠে যাবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোও প্রায় ছিয়ানব্বই দশমিক ছয় শতাংশ পণ্যে শুল্ক ছাড় পাবে, যার ফলে বছরে প্রায় চারশ কোটি ইউরো সাশ্রয় হবে। এতে উৎপাদন ও বাণিজ্য ব্যয় কমে দাম প্রতিযোগিতা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্ক ছাড়ের ফলে ভারতের পোশাক শিল্প সরাসরি দামের সুবিধা পাবে। তুলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বড় শিল্পভিত্তি, দক্ষ জনবল ও সরকারি নীতিসহায়তা ভারতের এই সুবিধাকে আরও শক্তিশালী করবে। এতে ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় পোশাক তুলনামূলকভাবে সস্তা ও সরবরাহে দ্রুত হতে পারে।
বাংলাদেশের ইউরোপীয় বাজারে অবস্থান
১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদায় বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে বাংলাদেশ ইউরোপীয় বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে চীনের পর বাংলাদেশ ইউরোপে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী। ডেনিম, ট্রাউজার ও টি-শার্টের মতো পণ্যে বাংলাদেশ চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির অর্ধেকের বেশি ইউরোপীয় দেশগুলোতে গেছে, যার মূল্য প্রায় এক হাজার নয়শ একাত্তর কোটি ডলার। তবে চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর তিন বছরের রূপান্তরকাল শেষ হলে, ২০২৯ সালের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা বা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি না থাকলে ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় বারো দশমিক পাঁচ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে।
ভারতের লক্ষ্য ও নতুন প্রতিযোগিতা
ভারত এই চুক্তিকে রপ্তানি বৃদ্ধির বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইউরোপে টেক্সটাইল রপ্তানি সাতশ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য বাজার দখলের প্রত্যাশা করছে দিল্লি।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক পরিচালক মোহিউদ্দিন রুবেল বলেন, প্রভাব তাৎক্ষণিক না হলেও দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে ভারতীয় পণ্য ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হবে, ফলে ডেনিম, টি-শার্ট ও ট্রাউজারের মতো পণ্যে অর্ডার স্থানান্তরের ঝুঁকি বাড়বে।
বিশ্ববাজারে বাড়তি চাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমেছে। কানাডা, আমেরিকা ও কয়েকটি ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি আয়ও হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, নীতিগত পরিবর্তন ও অতিরিক্ত সরবরাহ ইউরোপীয় ক্রেতাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের লাভের মার্জিনে চাপ সৃষ্টি করছে।
এ ছাড়া উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও কাঁচামালের দামের অস্থিরতা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও শ্রম অধিকার মানার বাড়তি চাপও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
নীতিগত সহায়তা ও করণীয়
শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নীতিগত সহায়তা জরুরি। টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠনের নেতারা কর ছাড় ও প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন। নিট পোশাক খাতের নেতারা বলেছেন, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা একটি বড় নীতিগত দুর্বলতা।
তবে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারে রপ্তানি বাড়ার কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত রয়েছে। এসব বাজারে কৌশলগত সম্প্রসারণ ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইইউ-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নতুন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। তবে সময়োপযোগী নীতি সহায়তা, বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিতকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
















