শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে বিতর্কিত পোস্ট প্রকাশের ৯ ঘণ্টা পর হ্যাকিংয়ের দাবি—বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয়
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত নারীবিদ্বেষী পোস্টের জন্য দলটি হ্যাকারদের দায়ী করলেও বিএনপি প্রশ্ন তুলেছে—৯ ঘণ্টা পর হ্যাকিংয়ের দাবি কতটা যৌক্তিক এবং কেন রাত ৩টায় জিডি করা হলো?
রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত একটি পোস্ট। শনিবার বিকেলে প্রকাশিত ওই পোস্টে নারীদের কর্মজীবন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।
পরে রাতে জামায়াত জানায়, তাদের আমিরের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেল হ্যাক করা হয়েছে এবং ওই পোস্ট তারা করেননি। তবে এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি।
রোববার গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, “সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে যে, নারীবিদ্বেষী পোস্টের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর সমালোচনার মুখে, রাত ১টার দিকে আইডি হ্যাকের দাবি কতটা যৌক্তিক?”
কী ছিল সেই বিতর্কিত পোস্টে?
শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেল থেকে শনিবার বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে প্রকাশিত পোস্টে লেখা হয়, “আমরা বিশ্বাস করি যে যখন মহিলাদের আধুনিকতার নামে ঘর থেকে বের করা হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়। এটি অন্য কোনো রূপে পতিতাবৃত্তির মতই।”
এই পোস্ট প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। নারী অধিকার কর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতারা এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।
রাত ১টায় হ্যাকিংয়ের দাবি, রাত ৩টায় জিডি
পোস্ট প্রকাশের প্রায় ৯ ঘণ্টা পর, রাত ১২টা ৪০ মিনিটে জামায়াত ফেইসবুকে এক বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, অত্যন্ত সমন্বিত পদ্ধতিতে হামলাকারীরা সাময়িকভাবে জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তবে দলের সাইবার টিম দ্রুত অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়।
জামায়াত দাবি করে, এই স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্ট প্রকাশিত হয় যা আমিরের কোনো বক্তব্য, মতামত বা অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।
পরে রাত ৩টা ৩০ মিনিটে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, তারা বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন।
বিএনপির প্রশ্ন: কেন এত দেরি?
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, “আমরা সবাই জানি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হল দ্রুততম সময়ে জনগণকে অবহিত করা, যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায়। কিন্তু এখানে দেখা গেল, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করে হ্যাকিংয়ের দাবি তোলা হয়েছে।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটেই হ্যাকিং ধরা পড়ে, তাহলে প্রায় ১২ ঘণ্টা পরে কেন জিডি করা হলো? এই বিলম্বের আদৌ কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে কি?
মাহদী আমিন আরও বলেন, “ওই সময়ের মধ্যে জামায়াত আমিরের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে অনেক পোস্ট হয়েছে, যার মধ্যে আমরা তার এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার কোনো পোস্ট দেখতে পাইনি। তাছাড়া হ্যাক হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার দাবিটিই বা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?”
আল জাজিরা সাক্ষাৎকারের পটভূমি
এই বিতর্কের আগে কয়েক দিন আগে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, তার দলের শীর্ষ পদে কখনো কোনো নারী যেতে পারবেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আল্লাহ নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো করে তৈরি করেননি।
ওই সাক্ষাৎকারের পরেই নারী অধিকার নিয়ে জামায়াতের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এখন এক্স পোস্টের বিতর্ক সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
“দুঃখজনক হলেও সত্য, এটি নতুন নয়”
বিএনপির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্য, এই রাজনৈতিক দলটির জন্য এটি নতুন কোনো আচরণ নয়। এর আগেও আমরা দেখেছি, একই দলের একজন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বোনদের উদ্দেশে ঠিক একই অশালীন শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।”
তিনি জামায়াতের নারীবিরোধী মনোভাবের আরও কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেন। “আমরা দেখেছি, এই দলের প্রধান প্রকাশ্যে নারীদের কাজের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার মতো পশ্চাৎপদ বক্তব্য দিয়েছেন। যে দল মুখে ‘ইনসাফ কায়েমের’ কথা বলে বেড়ায়, সেই দল কেন এবারের নির্বাচনে একটি আসনেও কোনো নারীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি?”
এনসিপির নারী নেতাদের পদত্যাগ
জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট করায় এনসিপির কয়েকজন নারী নেতা কিছুদিন আগে পদত্যাগ করেছেন। তারা প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
মাহদী আমিন বলেন, “যারা জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছেন, তারাও স্বীকার করেছেন যে এই দলটির কারণে তারা নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনকি নারী প্রার্থীদের পোশাক-পরিচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা চরম রুচিহীনতা ও নারীবিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।”
বিএনপির অবস্থান
বিএনপি দাবি করেছে, তারা নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্মান ও সমঅধিকারের পক্ষে। মাহদী আমিন বলেন, “এই ধরনের ভাষা ও মানসিকতা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটা প্রকাশ্যেই নারীবিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, বিভিন্ন আসনে আমাদের প্রার্থীদের নারী সদস্যরা নির্বাচনি প্রচারে নামলে তাদেরকেও অনলাইন, অফলাইনে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।”
এই বিতর্ক আগামী নির্বাচনে নারী ভোটারদের মনোভাবে কী প্রভাব ফেলবে, সেটি এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।














