মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পর গণতন্ত্রের পক্ষে রাস্তায় নামা তরুণদের একটি অংশের পরিণতি হয়েছে কারাগারে মৃত্যু। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অন্তত ৭৪ জন রাজনৈতিক বন্দি কারাগারে প্রাণ হারিয়েছেন।
২০১৯ সালে ইয়াঙ্গুনের ডাগন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় বন্ধুত্ব হয় শু থেইঙ্গি ও উইট ই আউংয়ের। উইট ই আউং ছিলেন প্রাণিবিদ্যার ছাত্রী, পরনে ছেলেদের মতো পোশাক, ছোট চুল আর স্পষ্টভাষী স্বভাবের জন্য আলাদা করে নজরে পড়তেন। দুজনই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একই সময়ে ইয়াঙ্গুনে আরেক তরুণ খান্ত লিন নাইং একটি ছাপাখানায় কাজ করতেন এবং ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করছিলেন, তিনিও ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়।
তারা ছিলেন সেই প্রজন্মের অংশ, যারা কয়েক দশক পর আধা-গণতান্ত্রিক মিয়ানমারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। গণতন্ত্রের দাবিতে রাস্তায় নামা হাজারো তরুণের ওপর শুরু হয় কঠোর দমন-পীড়ন। কেউ অস্ত্র ধরেন, কেউ পালিয়ে যান, আর অনেকে আটক হন কারাগারে। সেখানেই প্রাণ হারান কেউ কেউ।
রাজনৈতিক বন্দিদের সহায়তা সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে অন্তত ৭৪ জন তরুণ রাজনৈতিক বন্দি হেফাজতে মারা গেছেন। আরেকটি পর্যবেক্ষক সংগঠন জানিয়েছে, অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রদ্রোহ ও উসকানির অভিযোগে আটক মোট ২৭৩ জন বন্দি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন।
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা আগেই অভিযোগ করেছিলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে পদ্ধতিগত নির্যাতন, হত্যা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। যদিও সামরিক সরকার এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
জাতিসংঘ বলছে, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগ এবং বাস্তুচ্যুতির শিকার সবচেয়ে বেশি হয়েছে তরুণ প্রজন্ম। অভ্যুত্থানের পর থেকে আনুমানিক তিন থেকে পাঁচ লাখ তরুণ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
২০২১ সালে দমন-পীড়ন শুরু হলে শু থেইঙ্গি ইয়াঙ্গুন ছেড়ে চলে যান। কিন্তু উইট ই আউং থেকে যান এবং প্রতিরোধ আন্দোলনে যুক্ত থাকেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহ ও উসকানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাকে ইয়াঙ্গুনের কুখ্যাত ইনসেইন কারাগারে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে তিনি পরিবার ও বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ২০২৪ সালের এক চিঠিতে তিনি মাকে লিখেছিলেন, খাবার ও ওষুধ শেষ হয়ে গেছে, টাকা পাঠানোর অনুরোধও করেছিলেন। ওই চিঠিতে স্নায়ু ক্ষতি ও হাঁপানির চিকিৎসার ওষুধের তালিকাও ছিল। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে বলে দাবি করেন সহপাঠী ও ছাত্র ইউনিয়ন।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কারাগারের ভেতর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ১৯ জুলাই ২০২৫, ২৫ বছর বয়সে তিনি কারাগারেই মারা যান। কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ বললেও ছাত্র ইউনিয়ন বলছে, যথাযথ চিকিৎসার অভাব, ওষুধের সংকট ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বাধার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে খান্ত লিন নাইংকে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উসকানি ও বিদ্রোহের অভিযোগে তাকে ১৫ বছরের সাজা দিয়ে ইয়াঙ্গুন থেকে দূরের একটি কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কর্তৃপক্ষ চিঠিতে জানায়, বন্দি স্থানান্তরের সময় পালানোর চেষ্টা করলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তবে পরিবারকে তার মরদেহ দেখানো হয়নি, এমনকি আজও তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়নি। পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস, তিনি আদৌ মারা গেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
কারা-পর্যবেক্ষক সংগঠনের মতে, বন্দি স্থানান্তরের সময় পালানোর চেষ্টা করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক, কারণ বন্দিরা সাধারণত শৃঙ্খলিত অবস্থায় থাকেন। সংগঠনটি জানিয়েছে, মৃত্যুর আগে খান্ত লিন নাইংকে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।
এদিকে এশিয়ার অন্য দেশে তরুণদের আন্দোলনে সরকার পরিবর্তন হলেও মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা এখনও ক্ষমতায় টিকে আছে। সীমান্ত অঞ্চলে কিছু এলাকা হারালেও তারা বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ও আকাশশক্তি বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। সম্প্রতি সম্পন্ন নির্বাচনেও সামরিকপন্থী দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বন্ধু উইট ই আউংকে স্মরণ করে শু থেইঙ্গি বলেন, তিনি নিজে সংবাদ উপস্থাপক হতে চেয়েছিলেন, আর উইট ই আউং আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হতে চাইতেন। সবারই ছিল আলাদা স্বপ্ন, যা আজ অপূর্ণই রয়ে গেছে।
















