নাইজেরিয়ার কাদুনা রাজ্যের কুরমিন ওয়ালি গ্রামে ১৮ জানুয়ারির সকাল শুরু হয়েছিল অন্য সব রবিবারের মতোই। মানুষ গির্জায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কেউ কেউ সাপ্তাহিক বাজারে যাওয়ার কথা ভাবছিল। কিন্তু সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যেই গ্রামবাসী বুঝতে পারে, এই দিনটি আর স্বাভাবিক থাকছে না।
কাজুরু স্থানীয় সরকার এলাকার এই গ্রামে হঠাৎ করে সশস্ত্র বন্দুকধারীরা প্রবেশ করে। স্থানীয়ভাবে যাদের ডাকাত হিসেবে পরিচিত করা হয়, তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়ে। বাড়ির দরজা ভেঙে মানুষকে বের করে আনা হয়, একই সঙ্গে গ্রামটির তিনটি গির্জা থেকেও উপাসকদের টেনে বের করা হয়।
গ্রামের সব বের হওয়ার পথ বন্ধ করে বন্দুকের মুখে মানুষজনকে জঙ্গলের দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কেউ গির্জা থেকে, কেউ আবার বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি বাড়ি থেকেই একই পরিবারের ত্রিশের বেশি সদস্যকে অপহরণ করা হয়।
সেই পরিবারের আত্মীয় জুমাই ইদ্রিস এখনো শোক সামলাতে পারছেন না। ঘটনার দিন তিনি বাড়িতেই ছিলেন। চিৎকার শুনে দুই শিশুকে নিয়ে পাশের একটি বাড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। এভাবেই তিনি রক্ষা পান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, বাড়ি ও আশপাশের ঘরগুলো থেকে মানুষ তুলে নেওয়ার সময় প্রতিটি আর্তনাদ তিনি শুনেছেন।
তার বাড়িটি গ্রামের প্রান্তে, যেখানে অপহরণকারীরা যাতায়াত করে। তিনি বলেন, এখন তার পরিবারের সদস্যরা কী অবস্থায় আছে, তারা খেয়েছে কি না, কিছুই তিনি জানেন না।
সেদিন মোট একশ সাতাত্তর জনকে অপহরণ করা হয়। এর মধ্যে এগারো জন পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও গ্রামের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখনো বন্দি।
ঘটনার পর প্রথমে রাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেন। কাদুনা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা এটিকে গুজব বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু দুই দিন পর জাতীয় পুলিশ মুখপাত্র স্বীকার করেন, সত্যিই অপহরণ ঘটেছে এবং উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে।
রাজ্যের গভর্নর জানান, শুধু বন্দিদের উদ্ধার নয়, ভবিষ্যতে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের লক্ষ্য। গ্রামে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও বাসিন্দারা বলছেন, এতে তারা নিরাপদ বোধ করছেন না। তাদের অভিযোগ, শুরুতে যাদের অস্তিত্বই অস্বীকার করা হয়েছিল, এখন শুধু তাদের নাম তালিকাভুক্ত করতেই পুলিশ এসেছে।
হামলার কয়েক দিন পর গ্রামের সবচেয়ে বড় গির্জার ভেতরে আতঙ্কের চিহ্ন স্পষ্ট। দরজা উপড়ে ফেলা, উল্টে থাকা প্লাস্টিকের চেয়ার, সবকিছুই সেই ভয়াবহ মুহূর্তের সাক্ষী। এখানেই প্রথমে সবাইকে জড়ো করে পরে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
অপহৃতদের একজন মাইগিরমা শেখারাউ পরে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। তিনি জানান, তাদের হাত বেঁধে মারধর করা হয় এবং দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে জঙ্গলে নেওয়া হয়। সুযোগ বুঝে তিনি তার তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে একটি পরিত্যক্ত ঘরে লুকিয়ে পড়েন এবং পরে গ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন, তার পরিবারের অন্য সবাই এখনো বন্দি।
শুকনো মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, এই গ্রাম আর আগের মতো মনে হয় না। গ্রামের প্রধানও অপহৃত হয়েছিলেন, তবে পালিয়ে আসতে পেরেছেন। তিনি বলেন, মানুষ ভয়ে দিশেহারা, কেউ কেউ দিনের পর দিন না খেয়ে আছে, অনেক পরিবার পুরোপুরি নিখোঁজ।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, অপহরণকারীরা নিয়মিত গ্রামে এসে শস্যাগার ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনার দুই দিন পর তারা আবার গ্রামে এসে মুক্তিপণের দাবি জানায়। তারা অভিযোগ করে, সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় লুকানো দশটি মোটরসাইকেল গ্রামবাসীরা নিয়ে গেছে। যদিও প্রধান জানান, তারা কোনো মোটরসাইকেল দেখেননি। তবু তিনি জানেন, এটি কেবল শুরু, আরও দাবি আসবে।
ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। একজন বাসিন্দা বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এখানে থাকা মানে নিজেকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। সরকারের পক্ষ থেকে সামরিক পোস্ট স্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা অনেকের কাছে যথেষ্ট নয়।
জুমাই ইদ্রিসও গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি আর কখনো এখানে ফিরবেন না, শুধু চান তার পরিবারের বাকি সদস্যরা যেন জীবিত ফিরে আসে।
















