ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা মন্তব্য করেছেন, মিঞাঁ মুসলমানদের আসামে নয়, বাংলাদেশে গিয়ে ভোট দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেছেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি করা দরকার যাতে তারা আসামে থাকতে অস্বস্তি বোধ করেন এবং রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। মিঞাঁ মুসলমানদের বিরোধিতার বিষয়টি আড়াল করার কোনো প্রয়োজন নেই বলেও তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।
ভারতে মিঞাঁ শব্দটি মূলত আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের উদ্দেশে ব্যবহৃত একটি অবমাননাকর শব্দ, যার মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মুখ্যমন্ত্রী একাধিকবার এই সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বক্তব্য রেখেছেন।
আসামে শিগগিরই বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে সেখানে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে, যা অন্যান্য রাজ্যের নিবিড় সংশোধন থেকে আলাদা এবং আসামে নির্বাচনের আগে নিয়মিতভাবে হয়ে থাকে।
এই প্রক্রিয়ায় হিমন্ত বিশ্বশর্মা বিজেপি কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে সন্দেহভাজন বিদেশিদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিপুলসংখ্যক সাত নম্বর ফর্ম জমা দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই প্রায় পাঁচ লাখ আপত্তির ফর্ম জমা দিয়েছেন দলের কর্মীরা। ভোটার তালিকায় কারও নাম নিয়ে আপত্তি জানাতে যে কেউ এই ফর্ম ব্যবহার করতে পারেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসাম কংগ্রেস নেতৃত্ব সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে সংগঠিতভাবে আপত্তি তোলা হচ্ছে।
গত কয়েক দিনে একাধিক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, মিঞাঁ মুসলমানদের ভোটাধিকার খর্ব করাই তাঁর সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেছেন, নিবিড় সংশোধন হলে চার থেকে পাঁচ লাখ মিঞাঁ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। তাঁর ভাষায়, কংগ্রেস যতই সমালোচনা করুক, মিঞাঁদের ভোগান্তি নিশ্চিত করাই তাঁর কাজ।
এমনকি সাধারণ মানুষকেও তিনি মিঞাঁদের বিরক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেন, রিকশাভাড়া কম দেওয়া বা দৈনন্দিন আচরণে বিরক্ত করার মাধ্যমে তাদের রাজ্য ছাড়তে বাধ্য করা উচিত।
নিজের মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা বাড়লে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মিঞাঁ শব্দটি তাঁর তৈরি নয় এবং বাংলাদেশি মুসলমানরা নিজেরাই এই পরিচয় ব্যবহার করেন। তিনি দাবি করেন, মুসলমান শব্দটি ব্যবহার না করেই তিনি কথা বলছেন, যাতে ভূমিপুত্র মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত না লাগে।
ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তুলেছে যে, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। আসাম বিধানসভার বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া প্রধান বিচারপতিকে চিঠিতে অনুরোধ জানিয়েছেন, বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেখার জন্য।
চিঠিতে বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, শুধুমাত্র মিঞাঁ সম্প্রদায়ের ভোটারদের নোটিস দিয়ে চাপে রাখা এবং তাদের ভোট বাতিল করাই সরকারের উদ্দেশ্য। এ ধরনের বক্তব্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
এদিকে গৌহাটি হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনে ব্যাপক হারে আপত্তি তোলার ঘটনায় আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। কংগ্রেসসহ একাধিক রাজনৈতিক দল এই ইস্যুতে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছেও স্মারকলিপি জমা দিয়েছে।
রাইজর দলের সভাপতি ও বিধায়ক অখিল গগৈ বলেছেন, আসামের জনগণ কাউকে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে চাপে রাখার জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেনি।
















