বাংলাদেশের স্পিনিং শিল্পে কর্মরত শ্রমিক, কর্মকর্তা ও পেশাজীবীরা ব্যাপক চাকরি হারানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান নীতিগত জটিলতা ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে দেশের বিভিন্ন স্পিনিং কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে স্পিনিং শিল্প দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী চাপে রয়েছে। শিল্প প্রতিনিধিদের ভাষ্য, নীতিগত ভারসাম্যহীনতা, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থার অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্পষ্ট কৌশলগত রূপরেখার অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে স্পিনিং খাতের কর্মী ও কর্মকর্তারা সরকারের সামনে একাধিক দাবি ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তারা বলেন, পোশাক উৎপাদন একটি সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সুতা, কাপড়, রং ও সেলাই—সব খাতের পারস্পরিক সহযোগিতা জরুরি। একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বদলে পরিপূরক সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে টেকসই কর্মসংস্থান ও শিল্পের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বক্তারা আরও জানান, দেশে ৪০টির বেশি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই পুরো টেক্সটাইল ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করাকে তারা সময়ের দাবি হিসেবে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শুরুতে সাময়িক সহায়তা হিসেবে চালু হওয়া বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় শিল্পকে নির্ভরশীল করে ফেলেছে এবং দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। বক্তারা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এই সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য একটি সুসংগঠিত রূপান্তর পরিকল্পনার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিনামূল্যে কাঁচামাল সুবিধার সীমা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়, কারণ অতিরিক্ত ব্যবহারে পোশাক ছাড়া অন্যান্য টেক্সটাইল উপখাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিল্প প্রতিনিধিরা সরকারের প্রতি অন্তত ২০ বছরের একটি সুস্পষ্ট নীতিগত রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান, যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মীদের চাকরি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, রপ্তানি বৃদ্ধির পরও দেশে প্রকৃত মূল্য সংযোজনের স্পষ্ট হিসাব নেই। রপ্তানির বিপরীতে কী পরিমাণ আমদানি প্রয়োজন হচ্ছে, সে বিষয়েও স্বচ্ছ ধারণার অভাব রয়েছে। এর ফলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হয়নি।
বৈশ্বিক বাজার প্রসঙ্গে বক্তারা জানান, বিশ্ব টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানির বাজার যেখানে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের, সেখানে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাতের বাজারই প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। উচ্চমূল্যের এই খাতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রায় নেই বললেই চলে, যা নীতিগত দুর্বলতারই প্রতিফলন।
শিল্প নেতারা অভিযোগ করেন, এর আগেও যেসব দাবি ও সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল, তার কোনোটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তারা সরকারের কাছে দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যকর, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
তাদের সতর্কবার্তা, অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে স্পিনিং খাতে ব্যাপক কারখানা বন্ধ, বিপুল কর্মসংস্থান হ্রাস এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
















