যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের নামে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন অধিকারকর্মী ও প্রবাসী ফিলিস্তিনিরা। তাঁদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বহু দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, তারই প্রতিচ্ছবি।
গত তিন সপ্তাহে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় দুইজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর পাশাপাশি, পাঁচ বছরের শিশু লিয়াম রামোসকে ব্যবহার করে তাঁর আশ্রয়প্রার্থী বাবাকে ঘর থেকে বের হতে বাধ্য করে আটক করে কর্তৃপক্ষ। বাবা ও শিশুকে পরে টেক্সাসের একটি আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়। প্রশাসনের ভাষায়, এটিই অভিবাসন আইন প্রয়োগ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আইসের হেফাজতে অন্তত ৩ হাজার ৮০০ শিশু আটক ছিল, যাদের মধ্যে ২০টি ছিল নবজাতক। এসব অভিযানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী ফিলিস্তিনি ও আইন শিক্ষার্থী আহমাদ ইবসাইস বলছেন, এই ভয় তাঁর কাছে নতুন নয়। তাঁর ভাষায়, ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ হিসেবে তিনি বহু বছর ধরে একই ধরনের সহিংসতা, নজরদারি ও অপমানের অভিজ্ঞতা দেখেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এখন যে কৌশলগুলো দেখা যাচ্ছে, তা ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের দীর্ঘদিনের আচরণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
২০২৫ সালে আইসের হেফাজতে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব মৃত্যুর পেছনে খিঁচুনি, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, সংক্রামক রোগ, আত্মহত্যা ও অবহেলার কথা বলা হলেও দায় স্বীকার করেনি কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে দুই বছরে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর আইস যে ৬৮ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছিল, তাঁদের প্রায় ৭৫ শতাংশের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না। একইভাবে, বহু ফিলিস্তিনিকে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটক রাখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ও অর্থনীতিতেও। উত্তর ক্যারোলিনার শার্লটে অভিযানের পর এক সপ্তাহে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী স্কুলে যায়নি। লস অ্যাঞ্জেলেসে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ক্রেতারা ঘরে থাকায় বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ইবসাইস বলেন, সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে দিয়ে হাঁটার সময় গুলির ভয় এবং পরে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা পাওয়ার আশঙ্কা তাঁর পরিবারের জন্য চেনা বাস্তবতা। ফিলিস্তিনে এই সহিংসতা বহু আগেই শুরু হয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও বেড়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই পশ্চিম তীরে নিহত ২৪০ জনের মধ্যে ৫৫ জন ছিল শিশু।
তাঁর মতে, শিশুদের আটক, নির্যাতন ও পরিবারকে চাপে রাখতে ব্যবহারের ঘটনা দুই জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে। ফিলিস্তিনি শিশুদের যেমন দীর্ঘদিন বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রেও এখন এমন ভয় তৈরি হয়েছে যে আইনি অবস্থান থাকলেও কেউ নিরাপদ নন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই বাস্তবতার পেছনে রয়েছে একই ধরনের মানসিকতা—কিছু জনগোষ্ঠীকে কম মানবিক হিসেবে দেখা এবং নিরাপত্তার অজুহাতে দমনমূলক ব্যবস্থা চালানো।
তবে ইবসাইস স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি পুরোপুরি এক নয়। তাঁর ভাষায়, ফিলিস্তিনে রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যেই জনগোষ্ঠীকে মুছে ফেলার স্পষ্ট উদ্দেশ্য দেখা যায়, যা গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবুও তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে আজ মানুষ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যে স্বাদ পাচ্ছে, ফিলিস্তিনিরা তা বহু দশক ধরে ভোগ করছে।
তিনি বলেন, যখন রাষ্ট্র এমন বাহিনী নামায় যারা নাগরিকদের গুলি করে, শিশুদের কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে এবং আটককেন্দ্রে মানুষের মৃত্যু ঘটতে দেয়, তখন সেটিই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। যুক্তরাষ্ট্র হোক বা ফিলিস্তিন—যেখানে ক্ষমতা কিছু মানুষের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে, সেখানে এই চক্রই বারবার ফিরে আসে।
ইবসাইসের মতে, এই বাস্তবতা বদলাতে হলে মানুষকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং নিজেদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নিজেরাই নিতে হবে।
















