গাজার রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই গাজাবাসীর যাতায়াতের শর্ত নিয়ে ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। আগামী রোববার সীমান্তটি সীমিত পরিসরে চালু হওয়ার কথা থাকলেও কে কতজন গাজা ছাড়তে পারবে বা ফিরতে পারবে—তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ জরুরি চিকিৎসার জন্য সীমান্ত পেরোতে চাইছেন। কেউ কেউ পরিবারে ফিরে যেতে কিংবা পড়াশোনা চালু করতে আগ্রহী, যা দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে বন্ধ রয়েছে।
ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় ইসরাইল এমন শর্ত দিয়েছে যাতে গাজা থেকে বের হওয়া মানুষের সংখ্যা যেন ফিরে আসা মানুষের সংখ্যার চেয়ে বেশি হয়। তবে মিসর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানায়, প্রবেশ ও প্রস্থানের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখতে হবে। কায়রোর আশঙ্কা, ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে গাজার জনসংখ্যা কমানোর কৌশল নিচ্ছে।
উত্তর সিনাই প্রদেশের গভর্নর জানিয়েছেন, সব পরিস্থিতির জন্য মিসর প্রস্তুত। তবে বাস্তবে যে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা আরোপের কথা বলা হচ্ছে, তা গাজার জনগণকে বাছাই ও নিয়ন্ত্রণের একটি কাঠামোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গাজা ছাড়ার ক্ষেত্রে সরাসরি ইসরাইলি উপস্থিতি থাকবে না। বরং দূরবর্তীভাবে নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরার মাধ্যমে সন্দেহভাজন মনে হলে ইলেকট্রনিক গেট বন্ধ করে দেওয়া যাবে। অন্যদিকে গাজায় ফিরতে চাইলে যাত্রীদের একটি ইসরাইলি সামরিক চৌকিতে শারীরিক তল্লাশি, এক্স–রে পরীক্ষা ও জৈব পরিচয় যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
এই দ্বিমুখী ব্যবস্থাকে মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। মিসরের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা জানান, ইসরাইল ২০০৫ সালের সীমান্ত চলাচল সংক্রান্ত চুক্তি কার্যত এড়িয়ে যেতে চাইছে। তাঁর মতে, এটি একমুখীভাবে গাজাবাসীকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ, যা মিসর স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ব্যবস্থা কোনো স্বাভাবিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নয়; বরং এটি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মানসিকতা থেকে পরিচালিত একটি বাছাই প্রক্রিয়া। তাঁদের ভাষায়, গাজা ছাড়াকে সহজ আর ফিরে আসাকে ভীতিকর ও অপমানজনক করে তোলা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই নতুন কাঠামোর মাধ্যমে ইসরাইল রাফাহ সীমান্তকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানাতে চাইছে। এতে গাজার একমাত্র বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সংযোগস্থল রাজনৈতিক চাপ ও ব্ল্যাকমেইলের উপকরণে পরিণত হতে পারে।
এদিকে ইসরাইলের অবসরপ্রাপ্ত এক জেনারেল সম্প্রতি দাবি করেছেন, রাফাহ এলাকায় একটি বড় স্থাপনা নির্মাণের জন্য জমি পরিষ্কার করা হয়েছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। তাঁর মতে, এটি হবে একটি বিশাল শিবির, যেখানে লাখো মানুষের চলাচল মুখ শনাক্তকরণসহ নানা নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
সব মিলিয়ে রাফাহ সীমান্ত পুনরায় চালুর উদ্যোগ গাজাবাসীর জন্য স্বস্তির বদলে নতুন অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
















