মাথাব্যথার চেয়েও অনেক বেশি জটিল একটি স্নায়বিক রোগ হলো মাইগ্রেন। বিশ্বজুড়ে প্রায় একশ বিশ কোটি মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় এই সমস্যায় ভোগেন। অথচ এত ব্যাপক হলেও দীর্ঘদিন ধরে মাইগ্রেন কেন হয়, কীভাবে শুরু হয় এবং কীভাবে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইগ্রেনকে শুধু মাথাব্যথা হিসেবে দেখার ধারণা এখন বদলাচ্ছে। এটি আসলে পুরো শরীরকে প্রভাবিত করা একটি দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক সমস্যা, যার প্রকাশ ঘটে মাইগ্রেন আক্রমণের মাধ্যমে। এই আক্রমণের সময় মাথাব্যথার পাশাপাশি বমিভাব, আলো ও শব্দে অতিসংবেদনশীলতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, এমনকি নির্দিষ্ট খাবারের তীব্র আকাঙ্ক্ষাও দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গ্রেগরি ডুসর বলেন, মাইগ্রেন এখনো সবচেয়ে কম বোঝা স্নায়বিক রোগগুলোর একটি। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা রোগীর মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক সংকেতের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে শুরু করেছেন, কীভাবে একটি মাইগ্রেন আক্রমণ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে মাইগ্রেনকে নারীঘটিত মানসিক সমস্যা হিসেবে ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যদিও রোগীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নারী, এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গবেষণা ও অর্থায়ন বহু বছর পিছিয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক তেশামায়ে মন্টিথ বলেন, এখনো অনেক দেশে মাইগ্রেন নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা কেন্দ্র নেই।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইগ্রেন শব্দের বদলে মাইগ্রেন ডিসঅর্ডার শব্দটি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মাসে পনেরোর কম আক্রমণ হলে একে এপিসোডিক মাইগ্রেন এবং এর বেশি হলে ক্রনিক মাইগ্রেন বলা হয়। কর্মক্ষম বয়সে এই রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, ফলে কর্মজীবন ও অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ে।
মাইগ্রেন গবেষণার বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর উপসর্গ ও তথাকথিত ট্রিগারের বৈচিত্র্য। অনেক সময় যেগুলোকে ট্রিগার মনে করা হয়, সেগুলো আসলে আক্রমণের শুরুর দিকের উপসর্গ। নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেবি হে বলেন, মাইগ্রেন শুরু হওয়ার আগেই রোগীরা অবচেতনভাবে চকলেট বা নির্দিষ্ট খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন, পরে সেই খাবারকেই দায়ী করা হয়।
ব্রিটেনের কিংস কলেজ লন্ডনের স্নায়ুবিশেষজ্ঞ পিটার গডসবি বলেন, আলো বা গন্ধকে অনেক সময় ট্রিগার মনে হলেও, বাস্তবে আক্রমণের আগের পর্যায়ে মস্তিষ্ক অতিসংবেদনশীল হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মাইগ্রেন শুরুর আগেই দৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশ অতিসক্রিয় হয়ে পড়ে।
জিনগত গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলছে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতত্ত্ববিদ ডেল নাইহোল্ট জানান, মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত জিনগত প্রভাব থাকতে পারে। লক্ষাধিক রোগীর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো মস্তিষ্কের গঠন ও অন্যান্য রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
একসময় ধারণা ছিল, মাইগ্রেনের মূল কারণ মস্তিষ্কের রক্তনালির প্রসারণ। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, রক্তনালি জড়িত থাকলেও সেটি মূল কারণ নাও হতে পারে। বরং এটি অন্য জৈবিক প্রক্রিয়ার ফলাফল হতে পারে।
বর্তমান গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে মস্তিষ্কের কর্টেক্সে ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক তরঙ্গ, যাকে কর্টিকাল স্প্রেডিং ডিপ্রেশন বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষক মাইকেল মস্কোভিটজ বলেন, এই তরঙ্গ মস্তিষ্কের কার্যকলাপ দমন করে এবং ব্যথাসংবেদনশীল স্নায়ু সক্রিয় করে তোলে। ২০২৫ সালে এক রোগীর মস্তিষ্কে সরাসরি এই তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বড় অগ্রগতি অর্জন করেন।
তবে মাথাব্যথা অনুভূত হয় মস্তিষ্কের আবরণ মেনিনজেস ও ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর মাধ্যমে। এই মেনিনজেসে থাকা রোগপ্রতিরোধী কোষ অতিসক্রিয় হলে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা মাইগ্রেন আক্রমণের সূচনা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণেই অ্যালার্জি বা ঋতুচক্রের হরমোনগত পরিবর্তনের সঙ্গে মাইগ্রেনের সম্পর্ক দেখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে মাইগ্রেন গবেষণায় বড় সাফল্য এসেছে সিজিআরপি নামে একটি স্নায়ু-নিয়ন্ত্রক প্রোটিন শনাক্ত হওয়ার মাধ্যমে। মাইগ্রেন রোগীদের শরীরে এই উপাদানের মাত্রা বেশি পাওয়া যায়। এই তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি নতুন ওষুধ ইতোমধ্যে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে আক্রমণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আমিনাহ প্রাধান বলেন, মাইগ্রেনের জন্য একক কোনো কারণ নেই, বরং একাধিক পথ ও উপাদান মিলেই রোগটি তৈরি হয়। তাই ভবিষ্যতে চিকিৎসাও ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাইগ্রেন নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে ধীরে ধীরে এই জটিল রোগের রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসার পথ খুলে দিতে পারে।
















