টাইমকে সাক্ষাৎকারে পরিবেশ, গণতন্ত্র ও অর্থনীতি নিয়ে খোলামেলা তারেক রহমান
দল নিষিদ্ধের রাজনীতির বিরোধিতা, বিনিয়োগ ও তরুণ কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা
কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার নীতির বিরোধিতা করে তারেক রহমান বলেছেন, “আজ যদি একটি দল নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে কাল আমার দলও নিষিদ্ধ হবে না—তার নিশ্চয়তা কী?” যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী Time–এর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সাক্ষাৎকারে দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সংকট, পরিবেশ, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাইরে রাখার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও তিনি বলেন, নীতিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে তিনি নন। তবে অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির প্রশ্নে আপসহীন থাকার কথাও জানান।
পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় ১২ হাজার মাইল খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর পাঁচ কোটি গাছ রোপণ এবং ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থই হবে প্রথম বিবেচনা। তবে দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টাও থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বোয়িং বিমান ও জ্বালানি অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন, অথচ বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। “এই তরুণদের জনশক্তিতে রূপান্তর করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ,” বলেন তিনি। তার মতে, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।
স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে শ্রমিকদের দক্ষ করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার ভাষায়, “আমি যা পরিকল্পনা করেছি, তার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেও দেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।”
টাইমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ঢাকায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি হারান তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–কে। শোকের মধ্যেই তিনি এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে স্মরণ করে তিনি বলেন, যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব রয়েছে—মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও চাঁদাবাজি বন্ধ করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি নিজেকে আগের তুলনায় আরও নমনীয় ও সহনশীল হিসেবে তুলে ধরেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের ও মায়ের সমালোচনামূলক ব্যঙ্গচিত্রও শেয়ার করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
নির্বাচনী জরিপের বরাতে টাইম জানায়, বর্তমানে বিএনপির জনসমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর সমর্থন প্রায় ১৯ শতাংশ। তরুণদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কৌশলের কারণে জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা—মানুষ যেন রাস্তায় ও ব্যবসায় নিরাপদ থাকে।” রোহিঙ্গা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র–চীন ভূরাজনীতি এবং ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক—সবই আগামী সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা বলে উল্লেখ করে টাইম।
সবশেষে তারেক রহমান বলেন, “স্পাইডারম্যান সিনেমার সেই বিখ্যাত উক্তির মতো আমি বিশ্বাস করি—ক্ষমতার সঙ্গে আসে বড় দায়িত্ব।” ৫৪ বছরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আর জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়াই এখন তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
















