গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ব্যবহার করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। দেশজুড়ে নজরদারিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘোষণা আসার পর মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সোমবার যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব শাবানা মাহমুদ জানান, পুলিশের নজরদারি কার্যক্রমে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো হবে। এর অংশ হিসেবে বর্তমানে ব্যবহৃত ১০টি চলমান ফেসিয়াল রিকগনিশন ভ্যানের সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০টির বেশি করা হবে, যা সারা দেশে মোতায়েন করা হবে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ক্রয় সংস্থা ব্লু লাইট কমার্শিয়ালকে উদ্ধৃত করে জানা গেছে, ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যারিয়ার্সের মাধ্যমে ইসরায়েলভিত্তিক কোরসাইট এআই নামের একটি কোম্পানি এই সফটওয়্যার সরবরাহ করছে। কোরসাইটের প্রযুক্তি গাজায় চেকপোস্টে ফিলিস্তিনিদের শনাক্ত, অনুসরণ এবং আটক করতে ইসরায়েলি বাহিনী ব্যবহার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুলিশের নজরদারি তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এতে ব্যাপকভাবে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি গাজায় ব্যবহারের সময় প্রযুক্তিটির ভুল শনাক্তের কারণে শত শত ফিলিস্তিনি অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার ও আটক হওয়ার অভিযোগও উঠেছিল।
এর আগে এসেক্স পুলিশে ছয় মাসের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর ডিজিটাল ব্যারিয়ার্স ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দুই কোটি পাউন্ড ব্যয়ে এই প্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। যদিও গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের সমালোচনা করেছে যুক্তরাজ্য সরকার, তবুও নজরদারি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বে তারা এগিয়ে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কোরসাইটের পরিচালনা পর্ষদে ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাবেক সদস্যরা রয়েছেন, যা কোম্পানিটির ভূমিকা নিয়ে আরও প্রশ্ন তুলছে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রযুক্তি উত্তর গাজায় অবরোধ ও নজরদারি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার ফলে বোমাবর্ষণ, অনাহার ও রোগে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
কোরসাইটের সম্পৃক্ততার খবর প্রকাশের পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্য শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য সরকারের আইনগত দায় রয়েছে, কিন্তু তারা তা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। তার মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত কোম্পানির সঙ্গে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক বন্ধ করা উচিত।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচও যুক্তরাজ্যে পুলিশের ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবহারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, এটি সারা দেশে গোপনীয়তা ও বৈষম্যবিরোধী অধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘন ডেকে আনবে এবং মতপ্রকাশ, সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতাকেও ঝুঁকিতে ফেলবে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত নজরদারি প্রযুক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ব্যবহারের আগে মানবাধিকার যাচাই অত্যন্ত জরুরি। করদাতাদের অর্থ যেন কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘনে সহায়ক না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এই প্রযুক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী ধরনের মানবাধিকার যাচাই করা হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বিষয়টিকে ‘কার্যকরী বিষয়’ উল্লেখ করে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কোরসাইট ও ডিজিটাল ব্যারিয়ার্সের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
















