বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংঘাতে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর ভর করে যে নীতিগুলো প্রস্তাব করা হচ্ছে, সেগুলো টেকসই শান্তি আনতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। গাজা, ইউক্রেনের ডনবাস এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি—এই তিনটি অঞ্চলের সাম্প্রতিক উদ্যোগ তার উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংঘাতে ‘শান্তি উদ্যোগ’ হিসেবে অর্থনৈতিক হুমকি বা পুরস্কারকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইসরায়েল-সিরিয়া সংঘাত—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন পরিকল্পনাকে শান্তি মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এই পদ্ধতিকে নতুন মনে হলেও বাস্তবে এটি বহু দশক ধরে পশ্চিমা নব্য উদারনৈতিক শান্তি প্রচেষ্টার অংশ। সমালোচকদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে রাজনৈতিক ও জাতীয় প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার এই ধারণা অতীতেও ব্যর্থ হয়েছে।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ দখলকৃত ফিলিস্তিন। নব্বইয়ের দশকে শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর সময় ইসরায়েলি নেতৃত্ব ‘অর্থনৈতিক শান্তি’র ধারণা সামনে আনে। বলা হয়েছিল, আঞ্চলিক অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা আসবে। কিন্তু দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকায় বাস্তবে তা হয়নি। বরং ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার দিকে পরিস্থিতি গড়ায়।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক চার পক্ষের জোটের উদ্যোগ এবং পশ্চিম তীরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্রকল্পও দখল অবসানের মূল প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে যায়। এতে কিছু সীমিত গোষ্ঠী লাভবান হলেও সাধারণ মানুষের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। সমালোচকেরা বলেন, এই নীতিতে মুক্তির বদলে ব্যবস্থাপনা, সার্বভৌমত্বের বদলে নিরাপত্তা সমন্বয় এবং সমষ্টিগত অধিকারের বদলে ভোগবাদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
গাজা নিয়ে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও একই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পুঁজির সুযোগকে সামনে আনা হলেও ফিলিস্তিনিদের জাতীয় ও মানবাধিকার প্রশ্ন উপেক্ষিত থেকেছে। নিরাপত্তার সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে দখলদার শক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী, আর স্থানীয় জনগণকে শ্রমশক্তিতে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়েছে।
এ ধরনের পদ্ধতি শুধু ফিলিস্তিনেই নয়, অন্য এলাকাতেও প্রশ্নবিদ্ধ। গোলান মালভূমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির প্রস্তাব কিংবা ডনবাসে মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের ধারণা—সব ক্ষেত্রেই জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে একদিকে আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বাড়ার ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার কোনো নিশ্চয়তা তৈরি হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া বিনিয়োগ ও উন্নয়নের মাধ্যমে শান্তি আনা সম্ভব নয়। জাতীয় পরিচয়, সমষ্টিগত অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃতি ছাড়া কোনো অঞ্চল স্থায়ী স্থিতিশীলতায় পৌঁছাতে পারে না। অর্থনৈতিক প্রণোদনা রাজনৈতিক সমাধানের পর আসতে পারে, তার আগে নয়।
এই বাস্তবতায় নব্য উদারনৈতিক শান্তি প্রস্তাবগুলো অতীতের মতোই ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন পর্যবেক্ষকেরা।
















