৬০৮ কোটি টাকার প্রকল্পে বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠছে নিজস্ব কারখানা; নজরদারিতে আসছে সীমান্ত ও সমুদ্রসীমা
জাতীয় নিরাপত্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের লক্ষে আজ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিমানবাহিনীর জন্য নিজস্ব ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘সিইটিসি ইন্টারন্যাশনাল’-এর সঙ্গে আজ আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নীতিগত অনুমোদনের পর এই মেগা প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখছে। ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সামরিক ড্রোন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে একধাপ এগিয়ে যাবে। প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় থাকা সিইটিসি বিশ্বের ১১০টিরও বেশি দেশে রাডার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য স্বীকৃত। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল সামরিক শক্তিবৃদ্ধিই নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
নির্বাচনপূর্ব এই সময়ে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সমুদ্রসীমায় নজরদারি জোরদার করতে এই ড্রোন প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কঠোর ৫টি শর্ত মেনেই এই প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রকল্পের সারসংক্ষেপ ও আর্থিক রূপরেখা
মোট ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পটি আগামী চার বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। এর ব্যয় বিভাজন নিম্নরূপ:
- প্রযুক্তি ও অবকাঠামো: বৈদেশিক মুদ্রায় ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হবে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপন এবং উন্নত প্রযুক্তি আমদানিতে।
- কিস্তি ভিত্তিক পরিশোধ: চলতি অর্থবছরে ১০৬ কোটি টাকা, পরবর্তী দুই অর্থবছরে ১৫৫ কোটি করে এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে শেষ কিস্তিতে ১৫৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হবে।
- আনুষঙ্গিক ব্যয়: প্রায় ৩৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এলসি কমিশন, ভ্যাট ও সুইফট চার্জ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জাতীয় স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ড্রোন প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য বহুমুখী সুবিধা বয়ে আনবে:
১. সীমান্ত ও সমুদ্র নজরদারি: সীমান্তে অপরাধ দমন এবং বিশাল সমুদ্রসীমায় ব্লু-ইকোনমি রক্ষায় এই ড্রোনগুলো অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে।
২. বেসামরিক ব্যবহার: কেবল সামরিক নয়, ভবিষ্যতে কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণেও এই দেশীয় ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে।
৩. আমদানি বিকল্প: নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তা কৌশল
প্রকল্পটি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও প্রতিবেশী দেশের উদ্বেগের সম্ভাবনা থাকলেও এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন জানান, জাতীয় স্বার্থই এখানে মুখ্য। তিনি বলেন, “কিছু আঞ্চলিক উদ্বেগ থাকলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা নিরসন করতে হবে। রাজনৈতিক কারণে আগে এই প্রকল্প থমকে থাকলেও বর্তমান সরকার একে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।”
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৫ কঠোর শর্ত
৬ জানুয়ারি অনুমোদিত এই প্রকল্পের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় যে শর্তগুলো দিয়েছে:
- চলতি ও আগামী অর্থবছরের নির্ধারিত বাজেটের অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া যাবে না।
- এলসির (LC) মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে লেনদেন নিশ্চিত করতে হবে।
- অর্থ শুধুমাত্র এই প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট খাতেই ব্যবহারযোগ্য হবে।
















