স্পুফিং প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করে জান্তাকে জেট ফুয়েল ও বিস্ফোরক সরবরাহ; নেপথ্যে গণহত্যার মদদ
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও ইরাকের বসরা বন্দরের নাম ‘ভুয়া ট্রানজিট’ হিসেবে ব্যবহার করে মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে গোপনে জেট ফুয়েল ও বিস্ফোরক তৈরির উপাদান সরবরাহ করছে ইরান। বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ‘ইলেকট্রনিক স্পুফিং’ বা কৃত্রিম সংকেত ব্যবহার করে ইরানি জাহাজগুলো নিজেদের অবস্থান বাংলাদেশে দেখালেও বাস্তবে তারা ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে জ্বালানি নিয়ে মিয়ানমারে খালাস করছে।
এই জ্বালানি ব্যবহার করেই মিয়ানমার বিমান বাহিনী গত ১৫ মাসে স্কুল, হাসপাতাল ও ধর্মীয় উপাসনালয়সহ ১ হাজার ৭২৮ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান একদিকে রোহিঙ্গা গণহত্যার নিন্দা জানালেও তলে তলে বর্তমান জান্তা সরকারকে অস্ত্র ও জ্বালানি দিয়ে দেশটিতে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধকে সরাসরি উসকে দিচ্ছে।
রয়টার্সের উপগ্রহচিত্র ও ট্র্যাকিং তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ‘রিফ’ ও ‘নোবেল’ নামের দুটি ট্যাংকার এই গোপন বাণিজ্যের মূল হোতা।
‘স্পুফিং’ জালিয়াতি ও বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা
অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইরানি জাহাজগুলো যে কৌশলে বিশ্বকে ফাঁকি দিচ্ছে:
- ভুয়া অবস্থান: জাহাজগুলো তাদের জিপিএস বা অবস্থান সংকেতে দেখাচ্ছে তারা ইরাকের বসরা থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে যাচ্ছে। বাস্তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তারা এই ধরণের কোনো জাহাজ বা ট্রানজিটের বিষয়ে অবগত নন।
- স্যাটেলাইট প্রমাণ: সিনম্যাক্সের স্যাটেলাইট তথ্যে দেখা গেছে, যখন জাহাজটি চট্টগ্রামে থাকার সংকেত দিচ্ছিল, বাস্তবে সেটি ইরানের বন্দর আব্বাসে জ্বালানি লোড করছিল এবং পরবর্তীতে মিয়ানমারের থিলাওয়া বন্দরে খালাস করেছে।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান: জ্বালানি যখন মৃত্যুর কারণ
ইরান থেকে আসা ১ লাখ ৭৫ হাজার টন জেট ফুয়েল মিয়ানমারে পৌঁছানোর পর বিমান হামলার তীব্রতা বহুগুণ বেড়েছে:
১. বেসামরিক নিধন: ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইরানের ৯টি চালানের পর মিয়ানমার জান্তা ১ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে।
২. স্কুলে হামলা: ২০২৫ সালের অক্টোবরে চিন প্রদেশের ভানহায় একটি স্কুলে বোমা হামলায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। রয়টার্স বলছে, ওই হামলায় ব্যবহৃত জ্বালানি কয়েকদিন আগেই ইরান থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল।
৩. বিস্ফোরক সরবরাহ: সারের আড়ালে ইরান বছরে ৪ থেকে ৬ লাখ টন ইউরিয়া পাঠাচ্ছে, যা দিয়ে ড্রোন ও প্যারাগ্লাইডার থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা তৈরি করছে জান্তা বাহিনী।
আদর্শ বনাম কৌশল: ইরানের দ্বিচারিতা
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার সময় ইরান কড়া প্রতিবাদ জানালেও ২০২১ সালে জান্তা ক্ষমতা দখলের পর তাদের সাথে সখ্য গড়ে তোলে।
- গোপন সফর: ২০২২ সালে ইরানের একটি সরকারি প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে গাইডেড মিসাইল ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়ে বৈঠক করে।
- স্বার্থের রাজনীতি: ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, “কৌশলগত স্বার্থ যেখানে বড়, সেখানে ইরান তাদের আদর্শকে নমনীয় করতে দ্বিধা করে না।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও শঙ্কা
জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান থেকে আসা এই জ্বালানি সরাসরি গণহত্যাকে উসকে দিচ্ছে। এজন্য ইরানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। এদিকে, রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সাথে জান্তার যুদ্ধে ম্রাউক উ শহরের হাসপাতালে বিমান হামলায় ৩০ জন নিহতের ঘটনাতেও ইরানি জ্বালানির যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করে ইরান যেভাবে বিশ্বকে বিভ্রান্ত করছে, তা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
















